মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২, ০৬:১৬ পূর্বাহ্ন

ফের প্রশ্নবিদ্ধ নৌপরিবহন আইন

এম এ বাবর
  • আপডেট : শনিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২১, ৭:০২ pm

অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল আইন আছে; কিন্তু এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই। নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা নৌপরিবহন অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারণে আলোর মুখ দেখেনি নৌপরিবহন আইন-২০১৯। নৌযান তৈরি ও চলাচলে মানা হয় না বিধি। আর সঠিক তদারকিও করে না অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ। এতে মালিকদের মর্জি অনুযায়ী তৈরি নৌযান চলছে তাদের ইচ্ছেমতো। ফলে দেশে প্রতি বছরই ছোট-বড় লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযান দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আহত হয়ে হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে।

অতীতে ভয়াবহ লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটলেও এবার দেশের ইতিহাসে যাত্রীবাহী লঞ্চে গতকাল শুক্রবারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নৌপথ কর্তৃপক্ষের অনিয়ম ও উদাসীনতার কারণেই দেশের প্রায়ই ঘটছে লঞ্চসহ নৌদুর্ঘটনা। তা ছাড়া নৌযান তৈরি থেকে পরিচালনে দেশে বিদ্যামান আইনের কোনো বাস্তবায়ন নেই। এমনকি নৌযানে যাত্রীদের নিরাপদ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আইনের ৬২(২) ও ৬৬ (১) ধারাটিও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হয়নি। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় নৌযান দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। নৌপথের নৈরাজ্য ঠেকাতে বিদ্যামান আইনের বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

এদিকে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশও মানা হয় না। সংস্থাটির দুর্নীতি প্রতিরোধে সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন দীর্ঘদিনেও প্রকাশ করা হয়নি। এ ছাড়া একই অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একজন অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করে। তবে সেই অনুসন্ধান কার্যক্রমের অগ্রগতিও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কোনোভাবে শৃঙ্খলা ফিরছে না নৌপরিবহন অধিদপ্তরে।

অন্যদিকে অনিবন্ধিত নৌযানের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশের নৌপথ, বেড়েছে দুর্ঘটনা। পাশাপাশি বড় অঙ্কের রাজস্বও হারাচ্ছে সরকার। তা ছাড়া দেশে কত সংখ্যক বৈধ-অবৈধ নৌযান চলাচল করছে সেই সংখ্যা নিশ্চিত হতে ২০১৬ সালে শুমারির উদ্যোগ নিয়েছিল নৌপরিবহন অধিদপ্তর। কিন্তু সেই প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

নৌযানে যাত্রীদের নিরাপদ ও নিরপত্তা ব্যবস্থায় নৌপরিবহন আইন-২০১৯ এর ৬২(১) ধারায় বলা হয়েছে-‘নৌযান ডুবি, অগ্নিকাণ্ড, সংঘর্ষ, বিস্ফোরণ, ইত্যাদি দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও মোকাবিলার জন্য নির্ধারিত জীবন-রক্ষাকারী যন্ত্রপাতি, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি দ্বারা সজ্জিত না হইয়া এবং অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ, সংঘর্ষ ও অন্যান্য দুর্ঘটনা রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া কোনো অভ্যন্তরীণ নৌযান বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাইবে না।’

এ ছাড়া ৬২(২) ধরায়া বলা হয়েছে, প্রতিটি অভ্যন্তরীণ নৌযানে নিরাপদ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সিস্টেম বাস্তবায়ন করিতে হইবে যা বাৎসরিক সার্ভের সময় পরিক্ষা করিতে হইবে এবং কোন নৌযানে নিরাপদ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সিষ্টেম যথাযথ পাওয়া না গেলে সার্ভে সনদ জারী করা যাইবেনা। ৬২(৩) ধারায় বলা হয়েছে, নিরাপদ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সিস্টেম-এর আওতায় জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রপাতি, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির মাসিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়দায়িত্ব নির্ধারনসহ নিম্নবর্ণিত তথ্য প্রমাণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করিতে হইবে, যথা : (ক) প্রতি মাসে জীবনরক্ষাকারী ও অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম ইন্সপেকশনের তথ্য (খ) প্রতিমাসে জীবনরক্ষা ও অগ্নিনির্বাপণ মহরার তথ্য(গ) জরুরী অবস্থায় যোগাযোগের মাধ্যম, কন্টাক্ট তালিকা।(ঘ) জানমাল ও পরিবেশ রক্ষায় জরুরী অবস্থা মোকাবেলার প্রস্তুতি (ঙ) নৌযানের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা রক্ষায় গৃহীত ব্যবস্থার তথ্য।

আইনের ৬৬ (১) ধারায় কোন অভ্যন্তরীণ নৌযান বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যাত্রী পরিবহনের কার্যে ব্যবহূত হইলে, উক্ত নৌযানে বর্ণিত যাত্রী ও মালামাল বহন করা যাইবে না :- (ক) জরিপ সনদপত্রে নির্ধারিত সংখ্যার অতিরিক্ত যাত্রী। মাস্টার ব্রিজের ছাদের ওপরে কোন যাত্রী (গ) উপরের ডেকে কোন মালামাল। যাত্রী নিরাপত্তা ও পরিবহন-সংক্রান্ত বিধান লংঘিত হয় এইরূপে যাত্রী বা মালামাল এবং অননুমোদিত কোন স্থানে কোন যাত্রী বা মালামাল।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে ৬৬০টি। এসব দুর্ঘটনায় মারা যান প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ, আহত হয়েছেন অসংখ্য আর নিখোঁজ হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন। ২০১৫ সাল পরবর্তী সময়গুলোতেও দেশে থেমে থাকেনি লঞ্চডুবির ঘটনা। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বার্ষিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে। এ সময় প্রাণ যায় ৩ হাজারের অধিক মানুষের। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে (শুক্রবার) ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ আগুন লাগার ঘটনায়, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪০ জনের মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করেছে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, মৃত্যুর হিসাবে লঞ্চ দুর্ঘটনাকে দেশের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা বলা হয়। কিন্তু সরকার এটি নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। একটি দুর্ঘটনা ঘটে গলে তড়িঘড়ি তদন্ত কমিটি করা হয়, কিন্তু ওই কমিটির প্রতিবেদন ফাইল বনি হয়ে থাকে।

দেশে আদৌ নৌ চলাচল আইন আছে কি না প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এ আইন বাস্তবায়ন নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। নিয়ম অনুযায়ী, নৌযান নির্মাণের আগে নকশা নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। পরে নির্মিত নৌযান পরিদর্শন করে রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ দেন সার্ভেয়াররা, যা দেখিয়ে বিআইডব্লিটিএ থেকে রুট পারমিট নিতে হয়। কিন্তু এসব নিয়ম অনুসরণ না করেই হাজারো নৌযান চলাচল করছে। ফলে নৌ-পরিবহন খাতে দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা, ঘটছে দুর্ঘটনা।

তিনি আরো বলেন, লঞ্চে আপৎকালীন সময়ে জীবন রক্ষার জন্য বেশকিছু সরঞ্জাম থাকার কথা। লঞ্চের ধারণ ক্ষমতা অনুসারে এসব সরঞ্জাম থাকে না। এমনকি লাইফ-বয়া বা জ্যাকেটও থাকে না। নৌপরিবহন খাতের এমন অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে নৌযান শুমারি ও সকল নৌযান নিবন্ধনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৌযান ও নৌযন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মীর তারেক আলী বলেন, নৌপথ নিয়ন্ত্রক কর্তৃক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতি ও উদাসীনতার কারণেই প্রায়ই ঘটছে লঞ্চসহ নৌযান দুর্ঘটনা। নিবন্ধিত নৌযানগুলোর ফিটনেস সনদ সঠিক ভাবে হালনাগাদ করা হয় না। লঞ্চে আপদকালীন সময়ে জীবন রক্ষার জন্য বেশকিছু সরঞ্জাম থাকার কথা। লঞ্চের ধারণ ক্ষমতা অনুসারে এসব সরঞ্জাম যা থাকার কথা তার ন্যূনতমটাও রাখা হয় না। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, চালকদের অদক্ষতা-অনভিজ্ঞতা, লঞ্চের ফিটনেসের অভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে বহু মানুষের প্রাণহাণীর ঘটনার পরে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু রহস্য জনক ভাবে ওইসব কমিটির তদন্ত প্রতিদেনও আর প্রকাশ করা হয় না। ফলে এ খাতে যা ঘটার তাই ঘটছে।

তিনি বলেন, নৌযান ও নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দুর্ঘটনা এড়াতে ফিটনেস সনদ অবশ্যই থাকতে হবে। এগুলো নিশ্চিত করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে আসবে। তাছাড়া বড় বড় নৌ দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি যেসব সুপারিশ করে, তার বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয় না। বারবারই বলা হয় লোকবল কম। তবে লোকবল বাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। নৌ চলাচল নিরাপদ করতে এ বিষয়ে আরও নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর আবু জাফর মো. জালাল উদ্দিন বলেন, বিদ্যমান আইনেই নৌপরিবহন খাত পরিচালিত হচ্ছে। তবে জনবল সংকটে যথাযত তদারকি করা সম্ভব হয় না। এর মধ্যেও আমরা কাজ করছি। তবে আরো জনবল নিয়োগ দিলে নৌযানের মালিকেরা আমাদের কাছে আসবে। নিয়মিত সার্ভে করতে হলে দুই বছর পরপর ডকিং করতে হয়। সব নৌযানের ডকিং করার মতো নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ডকইয়ার্ড দেশে নেই। এ জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com