মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২২, ০২:১০ পূর্বাহ্ন

ডেমুর ৬৫৪ কোটি টাকা জলে: দেশীয় প্রযুক্তিতে সচলের চিন্তা

এম এ বাবর
  • আপডেট : শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১২:২৩ pm

প্রতি বছর রেলওয়ের গড় খরচ দুই হাজার কোটি টাকা। এই খরচকে আরো বাড়িয়ে রেলের লোকসানের পাল্লা ভারী করছে ডেমু ট্রেন। একেকটি ট্রেনের মেয়াদ ৩৫ বছর হলেও, কয়েক বছর গড়াতেই একে একে হতে থাকে অচল। বর্তমানে ২০টি ডেমু ট্রেনের মধ্যে ১৬টিই বিকল। বাকি চারটি চলছে কোনোরকম জোড়াতালি দিয়ে। আর প্রথম ৫ বছরে ডেমু ট্রেন থেকে রেলের ১৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয় হলেও, পরিচালনে খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

যোগাযোগ বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন থেকে ২০ সেট ডেমু ট্রেন কেনার সময়ই ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এমনকি এসব ডেমু ট্রেন আমদানির সময় রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট অনেকেরই মতামত নেওয়া হয়নি। তাই সরকারের রাজস্ব খাত থেকে ২০ সেট ডেমু ট্রেন (ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট) কেনা বাবদ ৬৫৪ কোটি টাকা এখন অনেকটা জলেই গেছে। আর ডেমু ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত ভুল ছিল মন্তব্য করে রেলমন্ত্রী বলেন, দেশীয় প্রযুক্তিতে ডেমু ট্রেনগুলো সচল করার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলমন্ত্রীর এ চিন্তা ফলপ্রসূ হবার সম্ভাবনা সামান্য।

রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর যাত্রীর চাপ কমানো এবং যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ২০১১ সালে চীনের তাংসাং রেলওয়ে ভেহিকেল কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে ৪২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০ সেট ডেমু কেনার জন্য চুক্তি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শুল্ক ও কর। এ ছাড়া প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ ও বিদেশ ভ্রমণ-ভাতাসহ ডেমু কেনা বাবদ মোট ব্যয় হয় ৬৫৪ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে এসব ডেমু ট্রেন দেশে আসে। ডেমু কিনতে পুরো টাকা খরচ করা হয় সরকারের রাজস্ব তহবিল থেকে। পরবর্তীকালে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমলাপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে প্রথম ডেমু ট্রেনের উদ্বোধন করেন।

এরপর একে একে ঢাকা-টঙ্গী (২২ কিলোমিটার), ঢাকা-জয়দেবপুর (দূরত্ব ৩৪ কিলোমিটার), জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ (৯০ কিলোমিটার), সিলেট-আখাউড়া (১৭৬ কিলোমিটার), ঢাকা-আখাউড়া (১২০ কিলোমিটার), চট্টগ্রাম-কুমিল্লা (১৫৫ কিলোমিটার), নোয়াখালী-লাকসাম (৪৮ কিলোমিটার), লাকসাম-চাঁদপুর (৪৯ কিলোমিটার), চট্টগ্রাম-নাজিরহাট (৩৭ কিলোমিটার), পার্বতীপুর-লালমনিরহাট (৭১ কিলোমিটার) এবং পার্বতীপুর-পঞ্চগড় (১৩২ কিলোমিটার) রুটে ২০ সেট ডেমু চলাচল শুরু করে। যদিও এসব ডেমু ট্রেন সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার দূরত্বে চলাচল উপযোগী। ক্রয়কালিন একেকটি ট্রেনের মেয়াদ ৩৫ বছর ধরা হলেও, কয়েক বছর গড়াতেই একে একে অচল হতে থাকে।

তা ছাড়া প্রায় সাড়ে ৬শ কোটি টাকার ডেমু ট্রেন কেনার আগে অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তা দুই মাস অবস্থান করেন চীনে। অথচ সুদূরপ্রসারী চিন্তা না করে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় অনুপোযোগী এই ট্রেনগুলো কেনা হয়। নিজস্ব সফটওয়্যারে বাংলাদেশে ডেমু চালানোর দায়িত্ব ছিল চীনা প্রকৌশলীদের। কোন রকমে মেয়াদ শেষ করেই দেশে ফিরে যায় তারা। কিন্তু এই সময়ে ট্রেনের সংশ্লিষ্ট কাউকে কোনো প্রশিক্ষণ দেয়নি চীনা প্রকৌশলীরা। ফলে মেরামত করতে না পারায় পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে ডেমুগুলো।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, রেলের ২০ সেট ডেমু ট্রেনের মধ্যে ১৬টি এখন বিকল। যে চারটি চলছে সেগুলোরও রয়েছে ভয়াবহ যান্ত্রিক সমস্যা। যাত্রী নিয়ে চলার পথে যখন-তখন এগুলো বিকল হয়ে যায়। ঢাকা বিভাগে চলাচলকারী ১২টি ডেমু ট্রেনের মধ্যে সচল আছে মাত্র দুটি। যান্ত্রিক সমস্যায় প্রায় দিনই বিকল হয়ে পড়ে এই ট্রেন। যাত্রীরা বলছেন, তারা এখন এগুলোতে উঠতেই ভয় পান। সেবার পরিবর্তে ডেমু যেন এক বিড়ম্বনার নাম। মাঝেমধ্যে নানা সমস্যায় মাঝপথে হঠাৎ বিকল হয়ে পড়ছে ডেমু। রাজধানীর কমলাপুরে ডেমু ওয়ার্কশপে গিয়ে দেখা যায় অবহেলা অযত্নে বিকল হয়ে পড়ে আছে ১০টি ডেমু। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় আগাছায় ঢেকে গেছে ট্রেন। অধিকাংশেরই নষ্ট হয়ে গেছে ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি।

অন্যদিকে রেলের কর্মকর্তারাই বলছেন, নষ্ট হওয়া ডেমু দেশে ঠিক করার মতো ব্যবস্থা নেই। ৬৫৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে রেল এ খাত থেকে যে আয় করেছে তা দিয়ে ট্রেনগুলোতে কর্মরত গার্ড, চালক আর টিটিই’র বেতনও হয় না। এমনকি তেলের খরচও উঠছে না। যাত্রীর চাপ সামাল দিতে যে ডেমু ট্রেনের আমদানি, তা চালিয়ে এখন রেলওয়েই বিরাট চাপে পড়েছে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্যিক বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলে ডেমু ট্রেনে যাত্রী উঠেছেন ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার। যার বিপরীতে রেল আয় করেছে ২১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এতে গড় হিসেবে প্রতিবছর ডেমু ট্রেন থেকে আয় হয়েছে ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এতে এ খাতে রেলের আয় তো দূরে থাক, তেল খরচও উঠছে না।

রেলের প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, শুরু থেকেই ডেমু ট্রেনগুলো দুয়েক দিন পরপর ত্রুটি দেখা দিত। তাই পুরোদমে এসব ট্রেন চালানো করা যেত না। এমনকি ডেমু ট্রেন ২০-৩০ কিলোমিটার দূরত্বে চলাচলের নির্দেশনা থাকলেও বেশিরভাগ চলত ৬০-১২০ কিলোমিটার দূরত্বে। অতিরিক্ত দূরত্বের কারণে এসব ট্রেনে সহসাই ত্রুটি দেখা দিত। বড় ধরনের ত্রুটি হওয়া বেশ কয়েকটি এখন চলাচল অনুপযোগী। কেননা ডেমু ট্রেন রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে যেসব যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম প্রয়োজন, তা দেশে নেই। তাই এসব যন্ত্রপাতির অভাবে মেরামত করতে না পারায় বেশির ভাগ ডেমু ট্রেন ওয়ার্কশপে অচল হয়ে পড়ে আছে।

পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ডেমু ট্রেনের পরিকল্পনা থেকে ক্রয় সবকিছুতেই অনিয়ম ছিল। আবার আনার পর তা চালানো হয়নি সঠিক নিয়মে। আর কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন বাইরে অবস্থান করলেও এগুলো সঠিক পরিকল্পনা নিতে ব্যর্থ। ডেমু ট্রেন স্বল্প দূরত্বে ব্যবহারের জন্য হলেও দূরপাল্লায় ব্যবহার করায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া, দেশে ডেমুর ওয়ার্কশপ ও যন্ত্রপাতি না থাকায় মেরামত সম্ভব হচ্ছে না। আর ডেমু রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতাও নেই রেল কর্তৃপক্ষের। এ ছাড়া অচল এসব ডেমু ট্রেন মেরামত করতে যে অর্থ খরচ করতে হবে, তা প্রায় নতুন ট্রেন কেনার সমান। তাই যেসব কর্মকর্তা ডেমু ট্রেন কেনার আগে পরিদর্শনের জন্য দীর্ঘদিন চীনে অবস্থান করেছিলেন, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার মত দেন তিনি।

রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, সার্বিক প্রস্তুতি না নিয়ে ডেমু কেনার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। এসব ট্রেনকে দূরপাল্লার ট্রেন হিসেবেও চালানো হয়েছে, যা হওয়ার কথা ছিলো না। তাই ট্রেনগুল দ্রুত নষ্ট হওয়ার এটাও একটা কারণ। বর্তমানে যে কয়টি ডেমু ট্রেন সচল রয়েছে, তা চালিয়ে তেল খরচের টাকাও ওঠেনা। সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির এ ট্রেনের ওয়ার্কশপ কিংবা যন্ত্রপাতি কিছুই নাই দেশে এতে মেরামতও সম্ভব হচ্ছে না। তবে এখন দেশীয় প্রযুক্তিতে ডেমু মেরামত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নিজস্ব প্রযুক্তিতে ডেমু ট্রেনের জন্য যে যন্ত্রাংশ লাগে তা তৈরি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com