সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০৩:৩১ পূর্বাহ্ন

যানবাহন নিয়ন্ত্রণ নেই: সমন্বয়হীনতায় বাড়ছে দুর্ঘটনা

এম এ বাবর
  • আপডেট : শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৯:২০ pm

দেশের আঞ্চলিক ও জাতীয় সড়ক-মহাসড়কে প্রতিনিয়ত বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কিছুটা হলেও বেড়েছে ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা। কিন্তু কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না দুর্ঘটনা। গত দুই বছর করোনা মহামারিতে লকডাউনের কারণে যানবাহন দীর্ঘ সময় বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারপরও তুলনামূলক অনেক বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে মৃত্যুর হারও ছিল ঊর্ধ্বগতি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও ইঞ্জিনিয়ারিংসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সমন্বয়হীনতা এবং জনসচেতনতার অভাবে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না সড়ক দুর্ঘটনা। তাই দেশের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সবগুলো সংস্থাকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ তাদের।

এদিকে বিগত ৪ বছর ধরে ২২ অক্টোবর পালন করা হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। তবুও নিরাপদ হয়নি দেশের কোনো সড়ক। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সড়কে চলে ট্রাক ও বাসের প্রতিযোগিতা। এমনকি রাজধানীর সড়কে চলাচল করছে অসংখ্য ফিটনেসবিহীন যানবাহন। ঢাকার অনেক ব্যস্ত সড়কে শিশু-কিশোর দিয়ে চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। ট্রাফিক বিভাগের অব্যবস্থাপনা ও মাসোহারা দিয়ে যত্রতত্র চলছে অবৈধ যানবাহন। তাছাড়া হালকা ও ভারী যানবাহন পরিচালনায় সংকট রয়েছে প্রশিক্ষিত চালকের। ফলে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। বড় বা মাঝারি দুর্ঘটনাগুলোর কিছুট গণমাধ্যমে আসলেও ছোট ছোট অনেক দুর্ঘটনা এবং এতে মৃত্যুর খবর স্থানীয়ভাবে চাপা পড়ে যায়। এদিকে প্রতিবার বড় কোনো সড়ক দুর্ঘটনার পরপরই উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তারপর সেই তদন্ত প্রতিবেদন আর প্রকাশ করা হয় না।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট দেশব্যাপী নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে একটি নজিরবিহীন আন্দোলনের সূচনা করেছিল শিক্ষার্থীরা। রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে নিহত এবং ১০ শিক্ষার্থী আহত হয়। এ দুর্ঘটনায় যে বিক্ষোভ শুরু হয়, পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ২০১৯ সালের ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে একটি খসড়া ট্রাফিক আইন অনুমোদন করা হয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের অযৌক্তিক দাবি ও চাপের কারণে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ বাস্তবায়নের আগেই সংশোধন করা হয়। সড়ক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলা নৈরাজ্যের মুখে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে সরকার ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ পাস করলেও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অপতৎপরতায় তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়। এই খসড়া সংশোধনের দাবিতেও দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিবহন মালিক- শ্রমিকরা ধর্মঘট করেন।

সড়ক দুর্ঘটনা এখন শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিক সমস্যা হয়েও দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুহার উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ। শিশু ও কর্মক্ষম বয়সের মানুষ বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংক বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিমাণ হ্রাস করতে এবং সড়ক ব্যবস্থা নিরাপদ করতে আগামী দশকে বাংলাদেশকে বিনিয়োগ করতে হবে প্রায় ৭৮০ কোটি মার্কিন ডলার।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিরাপদ সড়কের গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়কে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ সময়ের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একমতও হয়। এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে বহু দেশে সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তৎপরতা দৃশ্যমান নয়।

এদিকে বাংলাদেশ ইনিশিয়েটিভ (বিআই) ও ড্রাইভার্স ট্রেনিং সেন্টার (ডিটিসি) যৌথভাবে প্রকাশিত এক জরিপ প্রতিবেদনে জানায়, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৯ ও ২০২০ সালে ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায়, দেশে গত ছয় বছরে ৩১ হাজার ৭৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪৩ হাজার ৮৫৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আর ৯১ হাজার ৩৫৮ জন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ইনিশিয়েটিভ (বিআই) ও ড্রাইভার্স ট্রেনিং সেন্টার (ডিটিসি) যৌথভাবে প্রকাশিত এক জরিপে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান জানান, চলতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতি ৩৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ২০১৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি ৩৮ হাজার কোটি টাকা। যা আমাদের জিডিপির দেড় শতাংশ। ২০২০ সালে এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা।

তিনি জানান, আমাদের সড়ক দুর্ঘটনার ২৫ শতাংশ হয় অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর এই তিন মাসে। সড়কে কুয়াশা থাকার কারণে দুর্ঘটনাও বেড়ে যায়। এই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটেছে তার অর্থনৈতিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। তার মানে বোঝা যাচ্ছে, চলতি বছরের সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতি ২০১৯ কেও ছাড়িয়ে যাবে।

তিনি বলেন, বুয়েটের গবেষণা বলছে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩০ বছরের নিচে তরুণ প্রজন্মের মৃত্যুহার বেশি। কারণ তরুণদের বেশিরভাগই মোটরসাইকেল আরোহী। আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিড্যান্টের সুযোগ হারিয়ে ফেলেছি। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে অপার সম্ভাবনা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। দেশের যানবাহন পরিচালন ও নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করছে না। তাই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষ চালক তৈরিতে বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ দিলেন তিনি।

বিআই ও ডিটিসি-এর গবেষণা বলছে, মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনার পরিমাণ ২০১৯ সালে ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। সেটা এখন ২৩ শতাংশে চলে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে ক্যানসারের সেলের মতো এই যানের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু মোটরসাইকেল চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। ২০১৬ সালে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল আট লাখ ২০২০ সালে, সেটা ৩২ লাখে দাঁড়িয়েছে। চার বছরে মোটরসাইকেলের সংখ্যা চারগুণ বেড়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায়, ২০১৫ সালে ৬ হাজার ৫৮১টি দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৬৪২ জন নিহত হন। ২১ হাজার ৮৫৫ জন। ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩১২টি দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৫ জন নিহত হন। আহত হন ১৫ হাজার ৯১৪ জন। ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯ দুর্ঘটনায় মারা যান ৭ হাজার ৩৯৭ জন। ১৬ হাজার ১৯৩ আহত হন। ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫১৪ টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৭ হাজার ২২১ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। ২০১৯ সালে ৫ হাজার ৫১৬ দুর্ঘটনায় নিহত হন ৭ হাজার ৮৫৫ আর ১৩ হাজার ৩৩০ আহত হন। ২০২০ সালে ৪ হাজার ৮৯১টি দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৬৮৬ জন মারা গেছেন এবং ৮ হাজার ৬০০ জন আহত হয়েছেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ২২১ জনের মৃত্যু হয়েছিল, পরের বছর মারা গেছেন ৭ হাজার ৮৫৫ জন।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বলেন, সরকারের নির্বাচনি নানা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হলেও তৃতীয় মেয়াদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে নিরাপদ সড়কের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ, দক্ষচালক ও পরিবহনকর্মী তৈরিতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে অবৈধ যানবাহন এবং অদক্ষ চালক। এসব কারণে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না।

তিনি বলেন, ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রকোপে দেশব্যাপী লকডাউনে পরিবহন বন্ধ থাকার পরও ৪ হাজার ৮৯১ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৬৮৬ জনের প্রাণ গেছে। জাতিসংঘ ২০১১ সাল থেকে ২০২১ সালকে সড়ক নিরাপত্তা দশক ঘোষণা করে সদস্য দেশগুলোর সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছিল। অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদশ সে অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেনি।

সড়কে নিরাপত্তামূলক র্কমসূচির বাজেট বাড়ানো, গবেষণা, সভা-সেমিনার, প্রচারের মাধ্যমে গণসচতেনতা তৈরির পাশাপাশি সড়কে ‘চাঁদাবাজি বন্ধ করারও দাবি জানান তিনি।

এ ছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং ট্রাফিক বিভাগের ‘অনিয়ম-দুর্নীতি’ বন্ধ করে সমন্বিতভাবে দেশের যানবাহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাকে পরিচালনের পরামর্শ দিলেন তিনি। একই সাথে র্দীঘদিন ধরে আটকে থাকা ১২ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স দ্রুত চালকদের হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান মোজাম্মেল হক।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর

Add

© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com