মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ০১:৩১ অপরাহ্ন

শুধু আবাসন নয়, ভূমিহীনদের কর্মসংস্থানও নিশ্চিত হোক

আমান উল্লাহ চৌধুরী:
  • আপডেট : শুক্রবার, ২৩ জুলাই ২০২১, ১:২০ pm

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনি ইশতেহারে বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল দেশের সব মানুষের জন্য মাথাগোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা। সরকার তাই গৃহহীন ও ভূমিহীনদের ঘর প্রদানে পদক্ষেপ নেয়। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মধ্যে ৫৩ হাজার ৩৪০টি জমিসহ বাড়ি বিতরণ করা হয়। গত ২০ জুন প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই গৃহহীনদের মধ্যে বাড়ি বিতরণ করেন। প্রথম দফায় প্রায় ৫০ হাজার বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি ঘরের জন্য পরিবহন খরচসহ ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বাজেট ধরা হয়েছিল। এবার তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা করা হয়। ভূমিহীন, গৃহহীনদের সরকার যে ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছে, তা বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের অর্জন।

ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ‘আশ্রয়ণ’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়, যা প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। ১৯৯৭ থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ২০ হাজার ৫২টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এ বছর যুক্ত হলো আরো অর্ধলাখের বেশি। দেশে একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না। এমন লক্ষ্যে ‘মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে দেশের সকল ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য গৃহ প্রদান নীতিমালা ২০২০’ প্রণয়ন করা হয়। ২০২০ সালের জুনে সারা দেশে ভূমিহীন ও গৃহহীন ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬২২টি পরিবারের তালিকা করা হয়। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয় তাদের জীবন বদলের উদ্যোগ।

ভূমিহীন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন এবং তাদের ঋণপ্রদান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে সক্ষম করে তোলা এবং আয়বর্ধক কার্যক্রম সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য। বাসস্থানের সাথে সাথে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্নের সম্পর্ক নিবিড়। বাসস্থানের পর উপকারভোগীদের খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত ও তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা সরকারেরই দায়িত্ব। এটা সাংবিধানিক অধিকার। পৃথিবীতে নানা দেশে মানুষ রাষ্ট্র হতে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় ও হচ্ছে। নিঃস্ব মানুষ মাথাগোঁজার ঠাঁই নিয়ে যে জীবনযুদ্ধ করছে দীর্ঘদিন ধরে, সেটি ঘুচিয়েছে এই সরকার যা অনন্য নজির পৃথিবীর বুকে।

কিন্তু গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর সচ্ছল পরিবারের লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়স্বজনরা পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। উপকারভোগীদের ত্রুটিপূর্ণ তালিকাসহ নানা অনিয়মের কথা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এই প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম ধাপে আবাসন বণ্টনে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর সচ্ছল পরিবারের লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়স্বজনরা পেয়েছেন এমন খবর প্রকাশিত হয় জাতীয় দৈনিক যুগান্তরে। এছাড়া এ কাজে ইউপি সদস্যরা ঘর পাওয়া ২৫ জনের কাছ থেকে ৬-১০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।

শুধু তা-ই নয়; ঘর পাওয়াদের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে বিনা পয়সায় মাটি কাটা ও মাটি ভরাটের কাজসহ শ্রমিক হিসেবেও খাটানো হচ্ছে এমন খবরও এসেছে পত্রিকায়। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকৃত গৃহহীনদের বাড়ি বানাতে এক নম্বরের বদলে দুই নম্বর ইট ব্যবহার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায়! এমন খবর ছেপেছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউন। ইটভাটা মালিকের অভিযোগ, ইউএনও নিজে তার ভাটায় গিয়ে দুই নম্বর ইট পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে এসেছিলেন। জামালপুরের মাদারগঞ্জে প্রকৃত গৃহহীনদের জন্য প্রথম ধাপে ১২১টি বাড়ি নির্মাণের প্রস্তুতিতে কোনো ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী ভূমি কর্মকর্তা দায়িত্ব নিয়ে এ প্রকল্পটি দেখভাল করছেন। মুজিববর্ষ উপলক্ষে দেওয়া বরগুনায় ভূমি ও গৃহহীনদের জন্য বরাদ্দ করা ঘর হস্তান্তরের আগেই ধসে পড়েছে এমন খবর প্রচার হয়েছে ‘চ্যানেল টোয়ান্টি ফোর’ নামক বেসরকারি টেলিভিশনে। এ ধরনের খবর যেমন সরকারের সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে, তেমনি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারকে করে বাধাগ্রস্ত। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শুরুতে সুফল মিললেও অনেক ভালো উদ্যোগ পরবর্তীতে দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ভেস্তে যায়। টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দ বন্ধ রাখা হয়েছে এ কারণেই। এর বিপরীতে গৃহহীন দরিদ্র মানুষের জন্য বাসগৃহ তৈরি করে দেওয়ার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু এর সঙ্গে তাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও জড়িত।

অর্থনীতিবিদরা আশ্রয়ণ প্রকল্প প্রসঙ্গে বলেন, যাদের ঘর দেওয়া হয়েছে তাদের যদি ওই এলাকায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকে তাহলে এই পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হবে না। আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিচালক মাহবুব হোসেন বিভিন্ন গণমাধ্যমকে সাক্ষাতে বলেছিলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ভূমিহীন ও গৃহহীন ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করা হয়।’ আর জানা যায়, স্থানীয় প্রশাসন তালিকা তৈরি করে ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় দলীয় নেতাদের মাধ্যমে। এতেই ঘটে বিপত্তি। আমাদের প্রথমে খেয়াল রাখা উচিত, মানুষ কিন্তু যেখানে কাজ করে সেখানে থাকতে চায়। মানুষের যখন গ্রামে কাজ না থাকে তখন সে কাজের সন্ধানে শহরে চলে যায়।

ফলে সরকার দুটি ভাগে বিভক্ত করে গৃহহীনদের জন্য ঘর তৈরি করে দিতে পারে। একটি যারা ভূমি ও গৃহহীন এবং অন্যটি হচ্ছে যাদের ১ থেকে ১০ শতক জমি আছে কিন্তু ঘর নেই থাকলেও তা জীর্ণ; এমন দুই ভাগে গৃহহীন ও দুস্থদের চিহ্নিত করে প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। বর্তমান করোনা মহামারীতে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থান একটি বড় বিষয় আমাদের সামনে। এমন অবস্থায় ২০২১-২২ সালের বাজেটে বলা হয়েছে, সরকার দারিদ্র্য বিমোচনে যা ব্যয় করবে তা দেশের জিডিপির ১০.৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে যা ছিল ১০ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এতে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের ব্যয় বাড়বে না। তাহলে নতুন করে দরিদ্র হয়ে যাওয়া লোকদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ কী?

বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে ন্যূনতম দারিদ্র্যসীমা গিয়ে ঠেকেছে ১৫ শতাংশে যা আগে ছিল ১০ শতাংশ। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা ৩৫ থেকে ৪৩ শতাংশের বেশি হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, বাজেটে স্বাস্থ্য, শ্রম, গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশু অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যয়কেও দারিদ্র্য বিমোচনের অংশ হিসেবে ধরা হয়েছে। তবে সরকার এ নিয়ে কোনো পরিষ্কার ধারণা প্রদান করেনি। জনগণের জানার দরকার কেমন করে এসব খাতের ব্যয় প্রত্যক্ষ দারিদ্র্য বিমোচনের আওতায় আসবে।

এ বাজেট সরকার যেসব সংস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছে তা বড় বড় ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধাজনক। ভোক্তা সম্পর্কে কোনো আলোচনা করা হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, বাজেটে কর্মসংস্থান নিয়ে কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই। আবার বাজেটে সামাজিক সুরক্ষায় ১ লাখ ৭ হাজার ৬১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের তথা জিডিপির ৩.১ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের চেয়ে ৩ শতাংশের বেশি। সব হিসাব মিলে এ বরাদ্দ অকিঞ্চিৎকর। করোনায় জীবিকা ও সঞ্চয় হারিয়ে সরকারের ২ হাজার ৫০০ টাকা প্রণোদনাও কিছুই না। তবুও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বর্তমান বিশ্বব্যাপী সংঘটিত অতিমারীতে সরকারের চলমান এসব সহায়তা একটি শুভ উদ্যোগ। কিন্তু এর বিপরীতে এসব ভূমিহীন ও গৃহহীনদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও জরুরি। সেখানে বিরূপ প্রভাব ফেলছে নিত্য ভোগ্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি। সুতরাং এক্ষেত্রে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে বলে মনে করছি।

লেখক : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, আজকাল, ঢাকা।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com