শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ০৬:১৭ অপরাহ্ন

পানির দাম বৃদ্ধি: লোকসানে ঢাকা ওয়াসা

ইসমাইল আলী:
  • আপডেট : সোমবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২০

রাজধানী ও আশপাশ এলাকায় পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটির সরবরাহকৃত পানির মান নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানিও সরবরাহ করতে পারে না ওয়াসা। এছাড়া পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত। তবুও নিয়মিতই মুনাফা করে আসছিল ঢাকা ওয়াসা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপরও গত অর্থবছর পানির মূল্য বাড়ায় ঢাকা ওয়াসা। অথচ ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেকর্ড লোকসান করেছে এ সংস্থাটি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া ঢাকা ওয়াসার আর্থিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ওয়াসা মুনাফা করেছিল প্রায় ৩৯৭ কোটি টাকা। তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ২৯৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে সংস্থাটি। লোকসানের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, পরিচালন তথা বেতন-ভাতা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিক্রয় ও বিতরণ ইত্যাদি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি। এছাড়া সরকার থেকে গৃহীত ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। চলতি অর্থবছরও ওয়াসা লোকসান করবে বলে প্রাক্কলন করেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রাহকদের কাছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬৩ হাজার ৮৩৪ কোটি ৯৬ লাখ গ্যালন পানি সরবরাহ করে ঢাকা ওয়াসা। এতে ওয়াসার রাজস্ব আয় হয় এক হাজার ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ৩৫২ কোটি ২৬ লাখ গ্যালন পানি সরবরাহ করেছিল ঢাকা ওয়াসা। এতে ওয়াসার রাজস্ব আয় হয়েছিল ৯৮০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছর পানি সরবরাহ খাতে ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব আয় বেড়েছে ৬১ কোটি ১২ লাখ টাকা। আবার গত অর্থবছর সংস্থাটির পানি অপচয় হ্রাস পেয়েছে এক শতাংশীয় পয়েন্ট। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংস্থাটির পানির অপচয় হার দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ হার ছিল ১৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

এদিকে গত এপ্রিলে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট (১ হাজার লিটার) পানির দাম ১১.৫৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪.৪৬ টাকা নির্ধারণ করে ঢাকা ওয়াসা। এক্ষেত্রে দাম বাড়ানো হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট পানির দাম ৩৭.০৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। দাম বাড়ে প্রায় আট শতাংশ।

এর মাত্র ৯ মাস আগে অর্থাৎ গত অর্থবছর জুলাইয়ে পানির দাম পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি করে ওয়াসা। তবে করোনার মাঝে পানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে হাইকোর্টে রিট করা হলেও তাতে কোনো লাভ হয়নি।

তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে পয়োনিষ্কাশন খাত থেকে ওয়াসার আয় হয় ৩৬৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ৩৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঢাকা ওয়াসার সার্বিক আয় (পানি ও পয়োনিষ্কাশন) দাঁড়ায় এক হাজার ৪১৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ আয় ছিল এক হাজার ৩১৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

আয় বাড়লেও গত অর্থবছর বিভিন্ন খাতে ওয়াসার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম বেতন-ভাতা খাত। এ খাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ২০৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যা ছিল ১৫৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যয় ছিল ৮৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যা ছিল ৪০ কোট ৬৭ লাখ টাকা।

এদিকে বিক্রয় ও বিতরণ ব্যয় ২০১৯-২০ অর্থবছরে দাঁড়ায় ১৩৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থছরে যা ছিল ৯৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রশাসনিক ব্যয় দাঁড়ায় ৮১ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৫৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর বাইরে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যয় হয় ১৫ কোটি টাকা, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল সাত কোটি ৪৫ লাখ টাকা। যদিও করোনার মাঝে এসব ব্যয় বৃদ্ধি অযৌক্তিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সার্বিকভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঢাকা ওয়াসার পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় এক হাজার ২৩৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ৯৯৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছর সংস্থাটির পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ২৩৯ কোটি আট লাখ টাকা। ফলে গত অর্থবছর ওয়াসার পরিচালন মুনাফা কমেছে ১৩৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংস্থাটির পরিচালন মুনাফা হয় ১৭৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছর যা ছিল ৩১৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

পরিচালন মুনাফা কমলেও অ-পরিচালন আয় বেড়েছে ওয়াসা। গত অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ১২৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। তবে গত অর্থবছর ওয়াসার সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৫৮৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছর এর পরিশোধের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সুদ পরিশোধে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ দশমিক ১৩ গুণ।

এসব ব্যয়ের প্রভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঢাকা ওয়াসার লোকসান দাঁড়ায় ২৮৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। আর ১০ কোটি টাকা কর পরিশোধের পর নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৯৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ওয়াসার মুনাফা ছিল ৩৯৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা, যা সংস্থাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছর ঢাকা ওয়াসা মুনাফা করে ২৫৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছর ১৯১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৩৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৬৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৮১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল সংস্থাটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান মুঠোফোনে বলেন, বর্তমানে যে হারে দাম বাড়ানো নেয়া হচ্ছে তা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। এতে ওয়াসার লোকসান হচ্ছে। তবে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, পরিচালন ব্যয়, ঘাটতি ও ঋণ পরিশোধের অজুহাতে আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে পানির দাম বাড়ানো অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। সংস্থাটির হিসাবেও অস্বচ্ছতা রয়েছে। এগুলো ভালোভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com