1. babardhaka@gmail.com : admi2018 :
  2. news@ajkaal24.com : AjKaal24 .Com : AjKaal24 .Com
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৮:১৫ পূর্বাহ্ন

রাজারবাগের ঐতিহাসিক তীর্থ ভূমি গংগা সাগর দিঘী

রতন বালো
  • আপডেট : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

রাজধানীর সবুজবাগ থানার কালীবাড়ীর ঐতিহাসিক গংগা সাগর দিঘী ও শ্রীশ্রী বরদেশ্বরী কালী মন্দিরের নাম কম বেশি সকলে শুনেছেন। পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি রয়েছে বিনোদনের স্থান। তাই যারা ভ্রমণপ্রিয় ব্যক্তি বা কোন দর্শনীয় স্থান খুঁজে ফিরেন, তারা এখানে আসতে পারেন। আর আসার পূর্বে জেনে নিন এর অতীত বর্তমান অবস্থান। তাতে আপনাদের জানাশোনার অবকাশ বৃদ্ধি পাবে। এখানে আসতে হলে দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে সড়ক বাহনের মাধ্যমে নির্দ্বিধায় আসতে পারেন। দেখে যেতে পারেন কত পুরনো ঐতিহ্যবাহী এ মন্দির।

সবুজবাগের বাসাবো রাজারবাগের ১১.৪৪ একর জমির এরিয়া নিয়ে ঐতিহাসিক বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির প্রাঙ্গণের অবস্থান। বিশাল গঙ্গা সাগর দীঘি। মন্দির সংলগ্ন আশপাশের দক্ষিণ গাঁও, নন্দীপাড়া, মানিক দ্যা, বাসাবো, মান্ডা, মাদারটেক, গোড়ান এলাকায় যখন পানি থাকে না, তখন এ সমস্ত এলাকার লোকজন গঙ্গা সাগরের পানি নিয়ে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে গৃহের বিভিন্ন ধোয়া মোছার কাজ করে থাকে।

আর মন্দিরের প্রবেশ পথের ডান দিকে অফিস গৃহ, বাম দিকে শিব মন্দির যার মধ্যে শিবলিংগ স্থাপন করা আছে ।
আর এর সামনেই প্রধান মন্দির ও জিহজতলা মন্দির এর মনোরম পরিবেশ দেশে আপনাদের ভাল লাগবে। ভাল লাগবে জিহজতলা বৃক্ষের শীতল ছায়া। দিঘীর পূর্ব ও উত্তরকোনায় অবস্থিত মহাদেব এর তীর্থস্থান।

প্রধান মন্দির-এর পশ্চিমে গংগা সাগর দীঘি। গংগা সাগর দীঘি নামকরণের একটা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস রয়েছে। তাহলো মোগল স¤্রাট আকবর বাংলা বিজয়ের উদ্দেশ্যে তার প্রধান সেনাপতি রাজা মানসিংহকে এ বাংলায় প্রেরণ করেন। রাজা মানসিংহ ডেমরা অদুরে তৎকালীন রাজধানীসেনের ভাগের ঈশা খার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবার পূর্বে এখানে তাবু ফেলেন, তখন এলাকায় পানিয় জলের খুব অভাব ছিল বিধায় সৈন্য সামন্ত নিয়ে এ দীঘিটি খনন করেন, তার প্রমাণ¯^রুপ ১৯০৬ সালে প্রকাশিত পাশ্চাত্যের বিশিষ্ট পন্ডিত মনীষী সর্গীয় এফবি ব্রাংকলে বার্ট এর লিখিত ‘দি রোমান্স অব এন ইষ্টার্ন ক্যাপিটাল নামক গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। যার পৃষ্ঠা নং-৭৭, পরবর্তীতে বইটি বাংলায় অনুবাদ করেন জনাব রহিম উদ্দিন আফজে। বাংলা নাম ‘প্রাচ্যের রহস্য নগরী’ পৃষ্ঠা নং-৬১ উক্ত বিষয়ে লিপিবদ্ধ আছে।

রাজা মানসিংহ দীঘিটির নামকরণ করা হয় গঙ্গা সাগর দিঘী। দীঘিটির উত্তর-পশ্চিম কোণায় একটি মহাশ্মশানও প্রতিষ্ঠিত করে যান। এ দীঘির পূর্ব এবং দক্ষিণে জনসাধারণের সুবিধার জন্য ৩টি পাকা ঘাটলা নির্মাণ করা হয়েছে। পশ্চিম পার্শ্বে রয়েছে শিতলা মন্দির ও লোকনাথ বাবার আশ্রম। কাজেই বুঝতেই পারছেন মন্দিরটি দেশের একটি ঐতিহাসিক প্রাচীন ও পবিত্র ধর্মীয় তীর্থ স্থান হিসেবে এতদঅঞ্চলে সুপরিচিত। স্থানটি তীর্থ ভূমি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।

এখানে দেশ বিদেশের বুদ্ধমনিষী, ধর্ম যাজক, সাধু সন্তসহ বহু পর্যটক পরিদর্শন এবং অবগাহন করেন। এই তীর্থ ভূমিটিকে ১৩০৪ সালে শ্রী হলধর দে সরকার নামে স্থানীয় এক ধনাঢ্য জনহিতৈষী এবং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কালীমাতার নামে এবং রেজি: মিরাশী পাট্টা বা অর্পণনামা দলিলের মাধ্যমে চিরস্থায়ী দেবোত্তর করে দান করে যান।
পরবর্তীতে কৃপাময়ী দেবীসহ আরও কতিপায় ভক্তজন ধর্ম উদ্দেশ্যে কালী মাতার নামে কতক ভূমিদান করেন।
দানকৃত এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির মোট দেবোত্তর ভূমির পরিমাণ ১১.৪৪ একর। তখন থেকে এই দেবোত্তর সম্পত্তির আয়কৃত অর্থ দ্বারা এবং স্থানীয় ভক্তজনের সাহায্য সহযোগিতায় মন্দিরের পূজা অর্চনাসহ যাবতীয় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান প্রতিপালিত হয়ে আসছে।
অর্পণনামা দলিল দ্বারা নিয়োগকৃত সেবায়েত অনাথ বন্ধু চক্রবর্তী ১৩০৬ সালে মন্দিরটি পুন:সংস্কার করেন ও দাতার নির্দেশে নেচিবাচক শ্রীশ্রী বরদেশ্বরী কালীমাতা নামকরণ করেন। অনাথ বাবু চিরকুমার অবস্থায় বহু পূর্বেই মারা যান। তার মৃত্যুর পরে স্থানীয় জনসাধারণ ও ভক্তবৃন্দ মন্দিরের কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছেন।

এছাড়া বিভিন্ন তিথিতে নানা প্রকার উৎসব পালন করে থাকে। বিশেষভাবে উল্লেখ যে, পূর্ণিমা তিথিতে অষ্টমী স্নন, বারণী স্নান উপলক্ষে বসে মেলা। প্রতিবারের ন্যায় এ বছরও বিভিন্ন কর্মসূচী পালিত হয়েছে। কর্মসূচীর মধ্যে ছিলো গত ১ বৈশাখ আবাহন সঙ্গীন দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ প্রার্থণা ও মধুমুখ, ২ বৈশাখ ব্রক্ষপুত্র স্নান সহ তিন দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা বসে। এ মেলায় হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজন এই মেলায় অংশগ্রহণ করেছে। সর্বময় ধর্মচর্চা ও পুণ্যের আশায় বহু লোক সমাগত হয়। কিন্তু পূর্বেও মত এখনও জাকজমকপূর্ণ হয়। সেই সাথে আনন্দ মেলাও আগের মত বর্তমান মন্দির কমিটি নেতৃবৃন্দ পালন করে আসছে। বর্তমানে আগের মতও পূজা দেখতে পাওয়া যায় ।

মন্দির পরিদর্শনকালে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির সম্পত্তি দিন দিন মূল্যবান হওয়ায় একটি চিহ্নিত কায়েমী শক্তি দেবোত্তর সম্পত্তিটি আত্মসাৎ করার ষড়যন্তে লিপ্ত হয় এবং একটি অপশক্তি মন্দিরের বহু মূল্যবান সম্পদ বিনষ্ট করতে থাকে। এতে মন্দিরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে। ঐ চক্রটি মিথ্যা মামলা, জাল দলিল, নকল কাগজপত্র ইত্যাদির মাধ্যমে মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তির গ্রাস করার পাঁয়তারা চালিয়ে আসছে।

সম্প্রতি সম্পত্তি রক্ষার্থে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং মন্দির পরিচালনার জন্য ১৯৯৫ সালে মে মাসে ৫১ সদস্যবিশিষ্ট শ্রীশ্রী বরদেশ্বরী কালীমাতা ও শ্মশান কমিটি পুনগঠিত হয়। এ কমিটির বর্তমান সভাপতি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এর ৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর লায়ন চিত্ত রঞ্জন দাস দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আলাপকালে তারা বলেন, আমরা মন্দিরের পবিত্রতা ও সম্পত্তি রক্ষা করতে গিয়ে কমিটি কয়েকটি মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে। তাই আমি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। আর সেই সাথে মন্দিরের জায়গায় সীমানা নির্ধারণ করে রাউন্ডরি ওয়াল নির্মাণ হিসেবে গঙ্গা দিঘীর দক্ষিণে মার্কেট। উত্তর ও পূর্ব পাশে আবাসন গৃহ নির্মাণ করা হয়। এছাড়া পশ্বিম পাশে নির্মাণ করা হয় লোকনাথ ও শিতলা মন্দির। দক্ষিণ পশ্চিম কোনায় মহা-শ্মশানও নির্মাণ করা হয়।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৪ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) চিত্ত রঞ্জন দত্তের (সি আর দত্ত) (বীর উত্তম) গত ১লা সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার মানবিক সম্মানে গার্ড অব অনার শেষে সকাল ১১টায় আমাদের মহাশ্মশানে শেষকৃত্য করা হয়। সেখানে হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। মন্দির উন্নয়নে যে কোন সংখ্যালঘুর মৃতদেহ শেষকৃত্য করতে মৃতজনপ্রতি ১ হাজার করে টাকা নেয়া হয় বলে চিত্ত রঞ্জন দাস জানান।

উৎপল কুমার দাস নামের ঐ কমিটির অপর এক সদস্য জানান, আগে ঐতিহাসিক দিঘী থেকে স্থানীয় ভূমিদস্যুরা মাটি কেটে নিত। এটা বন্ধ করার জন্য বাউন্ডারি হিসেবে ১৬১টি দোকান। পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে মোট ৭০টি আবাসন গৃহ নির্মাণ করা হয়। যাতে বাইরের কেউ দীঘির পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে।

মন্দিরের পূজক গোপাল চক্রবর্তী বলেন, মন্দির এলাকার বসবাসরত মানুষ বলে সকল পূজা সম্পন্ন হয়। দির্ঘীর বাউন্ডারি হিসেবে এসব গৃহ ও দোকানপাট নির্মাণ করায় মন্দিরের পরিবেশ সুন্দর হয়েছে। সুষ্টু ও সুন্দর ভাবে সকল পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে যার কৃতিত্ব আমাদের বর্তমান সভাপতি লায়ন চিত্ত রঞ্জন দাস

গোপাল আরও বলেন, ঐতিহ্যাসিক এই নগরীর ঐতিহাসিক অনেক নিদর্শন আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ নিজেদের জানতে হলে এসব ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। আর সেই সাথে পাশাপাশি এসব ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহ সংরক্ষণ করতে হবে বলে গোপাল চক্রবর্তী জানান।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com