বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১, ০৬:০৭ অপরাহ্ন

বে. বি.: আবেদন হারাচ্ছে বিবিএ আগ্রহ বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • আপডেট : সোমবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

নব্বইয়ের দশকে দেশে ব্যবসার পরিবেশ আগের চেয়ে অনুকূল হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় তখন আর্থিক ও ব্যবসায়িক খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণেরও প্রবণতা দেখা যায়। এতে করে ব্যবসা প্রশাসনের মতো বিশেষায়িত বিষয়গুলোয় অনেক উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মীর চাহিদা তৈরি হয়। ঠিক একই সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে দেশের উচ্চশিক্ষা খাতেও। স্নাতক পর্যায়ে শুরু হয় ব্যবসায় প্রশাসনবিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রম বিবিএ (ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন)। এর সঙ্গে সঙ্গে উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসে বেসরকারি খাতও। ব্যাপক চাহিদা থাকায় শুরুতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকাশও ঘটেছে প্রধানত বিবিএ কার্যক্রমকে ঘিরেই।

দেশে বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষার যাত্রা ১৯৯২ সালে। ওই সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকাশ ঘটেছিল মূলত বিবিএ ডিগ্রির ওপর ভর করেই। বেসরকারি খাত বিশেষ করে ব্যাংক, বীমা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোয় তখন ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ কারণে চাকরির বাজারে বিবিএ স্নাতকদের কদর বেড়ে যায়। ফলে সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই বিবিএ প্রোগ্রাম চালু করে। প্রতি বছরই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বিবিএ স্নাতক বের হতে থাকে লক্ষাধিক।

তবে কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, দেশের আর্থিক ও ব্যবসায়িক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে। হ্রাস পাচ্ছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নির্ধারণ করা ঋণ প্রবৃদ্ধির ধারেকাছেও যেতে পারছে না বেসরকারি খাত। নতুন কোনো শিল্পোদ্যোগ না থাকায় নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না। বরং অনেক প্রতিষ্ঠানকেই এখন কর্মীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে দেখা যাচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এখন বিবিএ প্রোগ্রামে ভর্তি সংখ্যাও কমছে। এর বিপরীতে প্রকৌশল-সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেড়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক বছরে বিবিএ ডিগ্রিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যমতে, ২০১৩ সালে দেশের ৬৮ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ ডিগ্রিপ্রত্যাশী বা ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ১১২ জন। এরপর গত কয়েক বছরে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। যদিও এর বিপরীতে ব্যবসা শিক্ষায় স্নাতক করতে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। ২০১৯ সালে দেশের ৯৪ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ের শিক্ষার্থী কমে দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৬৯৫ জন। এ হিসেবে ছয় বছরের ব্যবধানে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী কমেছে ৩৫ শতাংশ।

এর বিপরীতে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ব্যাপকমাত্রায়। ২০১৩ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিজ্ঞান, প্রকৌশল, কৃষি ও চিকিৎসা বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৪ হাজার ৬০৪ জন। ২০১৯ সালে এসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮৯১-এ। সে হিসাবে ছয় বছরের ব্যবধানে এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৬০ শতাংশেরও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এসব বিষয়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং

(সিএসই) ও ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই)।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বণিক বার্তাকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা মোটা অংকের টাকা ব্যয় করে পড়ালেখা করে। তাই তারা পড়ার বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুব সতর্ক। চাকরির বাজারে চাহিদা থাকায় একসময় অনেকেই বিবিএ পছন্দ করেছে। এখন চাকরির বাজারের বিবিএ গ্র্যাজুয়েটদের সুযোগ কমেছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই বিবিএ পড়ার আগ্রহ কমবে। অন্যদিকে অটোমেশনের কারণে প্রকৌশল ও কারিগরির মতো অ্যাপ্লায়েড সাবজেক্টগুলোর চাহিদা অনেক বাড়ছে। তাই শিক্ষার্থীরা সিএসই, ইইই, মেকানিক্যালের মতো বিষয়গুলোতে আগ্রহী হচ্ছে। এছাড়া বৈশ্বিক চাকরির বাজারেও প্রকৌশল ও কারিগরি ডিগ্রিধারীদের চাহিদা বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বিবিএ ডিগ্রিধারী বেড়িয়েছে চাকরি বাজারের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। এজন্য তাদের বড় একটি অংশই কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে গিয়েছে। এ কারণে শিক্ষার্থীরা এখন আর বিবিএ পড়তে তেমন আগ্রহী হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) প্রেসিডেন্ট কামরান টি রহমান বলেন, একসময় বেসরকারি খাতে প্রচুরসংখ্যক বিবিএ গ্র্যাজুয়েটের কর্মসংস্থান হয়। সেটি দেখে অনেকেই বিবিএ ডিগ্রি নিতে শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিবিএতে অনেক বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে শুরু করে। তবে দেশের কর্মবাজারে এখন আর আগের মতো বিবিএ ডিগ্রির চাহিদা নেই। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও একই ধরনের চিত্র। একসময় বিবিএ ডিগ্রি থাকলে চাকরিরও একধরনের নিশ্চয়তা থাকত। সেখানে এখন অনেক শিক্ষার্থী বিবিএ ডিগ্রি নিয়েও চাকরি পাচ্ছে না। এজন্যই হয়তো বিবিএতে শিক্ষার্থীরা আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথের মূল ভিত্তিই গড়ে ওঠে বিবিএ প্রোগ্রামের ওপর নির্ভর করে। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট শিক্ষার্থীর ৭০-৮০ শতাংশই ছিল বিজনেস স্কুলের। সেটি এখন ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ২০১৩ সালে নর্থ সাউথে ব্যবসায় শিক্ষার মোট শিক্ষার্থী ছিল ১২ হাজার ৮৯৬ জন। ২০১৯ সালে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ১০ হাজার ২১৫-এ। সে হিসাবে ছয় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিজনেস স্কুলে শিক্ষার্থী কমেছে ২ হাজার ৬৮১ জন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নর্থ সাউথের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল হান্নান চৌধুরী বলেন, আসলে নর্থ সাউথে বিবিএ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও সেটির হার খুব বেশি নয়। তবে দু-একটি ছাড়া প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই বিবিএ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে অর্ধেক হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোও আগের বিকম ডিগ্রির নাম পরিবর্তন করে বিবিএ করে ফেলেছে। এখন একজন শিক্ষার্থী সরকারি কলেজ থেকে বিবিএর সনদ পেলে টিউশন ফি দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে কেন? অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানভেদে ডিগ্রিগুলোর গুণগত মানের পার্থক্য বুঝতে পারে না।

বিবিএ শিক্ষার্থী কমেছে রাজধানীর সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়েও। ২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ব্যবসায় শিক্ষায় শিক্ষার্থী ছিল ৪ হাজার ৫৭৫ জন। ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৭১ জনে। সে হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দুই বছরে ব্যবসায় শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমেছে ৩০ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের উপদেষ্টা ও সাবেক উপাচার্য এএনএম মেশকাত উদ্দীন বলেন, বেসরকারি খাতের চাকরির বাজারে চাহিদা থাকায় উচ্চশিক্ষা প্রার্থীরা বিবিএ প্রোগ্রামটিকে লুফে নিয়েছিল। গত কয়েক দশকে দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সারপ্লাস (প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত) বিবিএ গ্র্যাজুয়েট বের হয়েছে। তাই এখন আর বিষয়টির আগের মতো আবেদন নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে শিক্ষার্থী ভর্তির হার প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

একইভাবে ব্র্যাক, আইইউবি, ইউআইইউ, এআইইউবি, ইস্ট ওয়েস্ট, আইআইইউসি, এশিয়া প্যাসিফিক, আইইউবিএটি, স্টামফোর্ড, নর্দানসহ বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী কমেছে।

অন্যদিকে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই গত কয়েক বছরে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের শিক্ষার্থী বেড়ে গেছে। এর মধ্যে আইইউবি, ইস্ট ওয়েস্ট, এআইইউবি, ইউআইইউতে প্রকৌশল বিষয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।

প্রকৌশল বিষয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে রাজধানীর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী মোফিজুর রহমান বলেন, একসময় ইউআইইউর বিবিএতে প্রকৌশলের তিন গুণ শিক্ষার্থী ভর্তি হতো। এখন বিবিএর শিক্ষার্থী অনেক কমে গেলেও প্রকৌশলের শিক্ষার্থীর হার অনেক বেড়েছে। আসলে আমাদের প্রকৌশলের প্রোগ্রামগুলোর আলাদা একটি সুনাম রয়েছে, এজন্যই শিক্ষার্থীরা আগ্রহী হচ্ছে।

প্রকৌশলের শিক্ষার্থী বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উল্লম্ফন দেখিয়েছে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটিতে ২০১৩ সালে প্রকৌশল বিষয়ে শিক্ষার্থী ছিল ১ হাজার ২০২ জন। ২০১৯ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮২৬ জনে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক মিজানুর রহমান রাজু বলেন, আমাদের এখানে একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার পরপরই একটি ল্যাপটপ পেয়ে যায়। পাশাপাশি গুণগত শিক্ষার জন্য বিশ্বমানের ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এখান থেকে বের হয়ে কাউকে বেকার থাকা লাগছে না। এসব কারণেই শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামগুলো খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে ইইই, সিএসই, আইসিই, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বিষয়গুলো বেশি জনপ্রিয়।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com