বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১, ০৪:৫৭ অপরাহ্ন

এসিআই মোটরসের রাজস্ব ফাঁকির পাঁয়তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • আপডেট : মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০

এসিআই লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসিআই মোটরস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এসআরও সুবিধা অপব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি মোটরসাইকেল যন্ত্রাংশ সিকেডি (কমপ্লিট নক ডাউন বা বিযুক্ত অবস্থা) অবস্থায় আমদানির সুযোগ নিয়ে সিবিইউ (কমপ্লিট বিল্ড আউট বা সম্পূর্ণ যুক্ত অবস্থা) অবস্থায় আমদানি করেছে।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটির ২৫ কনটেইনার পণ্য আটক করে, যাতে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করেছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে প্রতিবেদন দিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসিআই মোটরস লিমিটেড চলতি বছরের ৫ জুলাই ভারত থেকে ২৫ কনটেইনার মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ আমদানি করে। এসব পণ্য খালাসে ২৩ আগস্ট পণ্য খালাসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়। ইয়ামাহা মোটরসাইকেল ইন সিকেডি ৪-স্ট্রোক পার্টস ঘোষণা দেয়া হয়। এসআরও ১৫৫-আইন/২০১৭/৪১ কাস্টমসের আওতায় সিপিসি ৪০০০-১৩০-এর মাধ্যমে রেয়াতি সুবিধায় শুল্কায়নের জন্য বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়। কিন্তু পণ্যগুলো সিকেডি নয়, সিবিইউ করে অসত্য ঘোষণায় খালাস নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে গোপন সংবাদ পায় কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এরই প্রেক্ষিতে বন্দরের সিসিটি ইয়ার্ডে থাকা ২৫ কনটেইনার পণ্যের চালানটির খালাস স্থগিত করা হয়।

পরে ২৮ আগস্ট কায়িক পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, পণ্য চালানের ঘোষণা দেয়া হয়েছে এইচএস কোড ৮৭১১.২০.২১ ইয়াহামা মোটরসাইকেল ইন সিকেডি ৪-স্ট্রোক ১৪৯সিসি ৯১ হাজার ৮৫৪ কেজি ও ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৫ কেজি। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় পণ্যের ওজন ঠিক থাকলেও এইচএস কোড পরিবর্তন করে (এইচএস কোড হবে ৮৭১১.২০.১১, দেওয়া হয়েছে ৮৭১১.২০.২১) খালাসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

আরও বলা হয়, এসিআই’র ঘোষণা দেয়া এইচএস কোড অনুযায়ী পণ্যটি সিকেডি অবস্থায় শুল্কায়ন ও খালাসযোগ্য, যার শুল্ককর হবে সিডি-২৫ শতাংশ, আরডি-৩ শতাংশ, ভ্যাট-১৫ শতাংশ, এআইটি-৫ শতাংশ ও এআইটি-৫ শতাংশ। কিন্তু পণ্যটি সিকেডি নয়, সিবিইউ অবস্থায় পাওয়া যায়। এইচএস কোড অনুযায়ী পণ্যটির শুল্ককর সিডি-১৫৬ শতাংশ, সিডি-৬০ শতাংশ, আরডি-৩ শতাংশ, ভ্যাট-১৫ শতাংশ, এটি-৫ শতাংশ ও এআইটি-৫ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানের ঘোষণা অনুযায়ী সিকেডি নয়, সিবিইউ অবস্থায় পার্টস আমদানি করা হয়েছে।

অপরদিকে এনবিআরের এসআরও-১৫৫-আইন/২০১৭/৪১/কাস্টমস এবং সংশোধিত এসআরও-৬৯-আইন/২০১৯/৫/কাস্টমস অনুসারে, মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্যাটেগরি-২ অর্থমূল্য সংযোজন কর নিবন্ধিত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যারা স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত বা আমদানি করা চেসিসের ক্ষুদ্র অংশ বা অংশবিশেষ আমদানিপূর্বক চেসিস তৈরি করে এবং এক বা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পার্টস নিজে প্রস্তুত করে এবং অবশিষ্ট পার্টস স্থানীয় ভেন্ডর থেকে সংগ্রহ বা আমদানি করে মোটরসাইকেল সংযোজন বা উৎপাদন করে। তবে শর্ত থাকে সেসব প্রতিষ্ঠান তৈরি চেসিস এবং অন্যান্য পার্টসসহ সম্পূর্ণ বিযুক্ত অবস্থায় (সিকেডি) মোটরসাইকেল আমদানি করে স্থানীয়ভাবে সংযোজন করে তা এর অন্তর্ভুক্ত হবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত এসআরও অনুযায়ী পার্টস প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনের কথা। সে অনুযায়ী রেয়াতি সুবিধা নেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সুইং আর্ম, হুইল, ফুয়েল ট্যাঙ্ক, হ্যান্ডেল বার এবং সিলিন্ডার সিবিইউ অবস্থায় আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে এ এসআরও ?সুবিধার মাধ্যমে সিবিইউ অবস্থায় আমদানি করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট ঢাকা উত্তর কমিশনারেটের অধীন। কাস্টমস গোয়েন্দা ভ্যাট ঢাকা উত্তর কমিশনারেটে যোগাযোগ করা হলে কাস্টমস গোয়েন্দাকে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ পার্টসের মধ্যে সুইং আর্ম উৎপাদন করে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার (কর্মাশিয়াল) শাকিল আহমেদ কাস্টমস গোয়েন্দাকে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি পার্টসের মধ্যে সুইং আর্ম স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে, অন্যান্য পার্টস আমদানি করে, ফাইনাল রং করে এবং চেসিসের অংশবিশেষ আমদানি ও স্থানীয় ভেন্ডর থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ সংগ্রহ করে চেসিস উৎপাদন করে। কিন্তু আমদানি করা পণ্য চালানে কাস্টমস গোয়েন্দা সুইং আর্মসহ হুইল, ফুয়েল ট্যাংক, হ্যান্ডেল বার ও সিলিন্ডার পাওয়া যায় এবং সব পণ্য ফাইনাল রং করা অবস্থায় পাওয়া যায়।

আরও বলা হয়, এনবিআরের আদেশ (৯(৪) কাস-১/৯৩/(অংশ-১)/১৬২/(১-৯), ৯.৪.১৯৯৭) অনুযায়ী, মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ইঞ্জিন (গিয়ার বক্সসহ) ও স্পিডোমিটার সম্পূর্ণ সংযোজিত অবস্থায় এবং অন্য সব যন্ত্রাংশ আলাদাভাবে আমদানি করলে তাতে সিকেডি হিসেবে গণ্য করা হয়। মোটরসাইকেলের মেজর কম্পোনেন্টগুলো কীভাবে আলাদা থাকবে, তা আদেশে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শর্তানুযায়ী ইঞ্জিন, গিয়ার বক্সসহ একত্রে সংযোজিত কিন্তু কার্বুলেটর ও ইনলেট পাইপ ইঞ্জিন থেকে বিযোগিত থাকবে। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় ইঞ্জিন এফআই (ফুয়েল ইনজেকশন) ইঞ্জিন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, যার সঙ্গে গিয়ার বক্স, থর্টেট বক্স, ইনলেট পাইপসহ ইঞ্জিন সংযোজিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। শর্তানুযায়ী ফ্রন্ট ফর্ক আলাদা থাকবে। কায়িক পরীক্ষায় ফ্রন্ট ফর্কের সঙ্গে ফ্রন্ট শক সংযোজিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। শর্তানুযায়ী রিম, হাব, স্পোক, নিপল, টায়ার ও টিউব আলাদা থাকবে। কায়িক পরীক্ষায় হুইল সম্পূর্ণ অবস্থায় পাওয়া গেছে।

শর্তানুযায়ী ব্রেক পেনেল আলাদা থাকবে। কায়িক পরীক্ষায় ব্রেক পেনেল সম্পূর্ণ সংযোজিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। শর্তানুযায়ী ওয়্যারহারনেস, ইগনিশন কয়েল, রেকটিয়ায়ার লাইট, ব্যাটারি ইত্যাদি আলাদা থাকবে। কায়িক পরীক্ষায় ইগনিশন কয়েল ইঞ্জিনের সঙ্গে সংযোজিত এবং ওয়্যারহারনেসের সঙ্গে সুইচ সংযোজিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। শর্তানুযায়ী সব সুইচ আলাদা থাকবে, কায়িক পরীক্ষায় ওয়্যারহারনেসের সঙ্গে সুইচ সংযোজিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। শর্তানুযায়ী ফুয়েল ট্যাংক অ্যাসেম্বল আলাদা আসবে। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় ফুয়েল ট্যাংক সম্পূর্ণ ও রং করা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এছাড়া শর্তানুযায়ী পণ্যগুলো ফাইনাল রং করা থাকবে না বলা হলেও কায়িক পরীক্ষায় ফাইনাল রং করা অবস্থায় পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পণ্যসমূহ সিকেডি অবস্থায় আমদানি করার দাবি করা হলেও সম্পূর্ণ সিবিইউ অবস্থায় পাওয়া যায়। সিকেডি পণ্যের মোট শুল্ককর ১৩১ শতাংশ। কিন্তু সিবিইউ’র মোট শুল্ককর ১৫১ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানের ঘোষণা অনুযায়ী পণ্যের মোট শুল্ককর সাত কোটি চার লাখ ৬১ হাজার ৭৪৬ টাকা, যা প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করেছে। কিন্তু কায়িক পরীক্ষা অনুযায়ী পণ্যের মোট শুল্ককর ১৯ কোটি ৫২ লাখ ২১ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি ১২ কোটি ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৫৩ টাকা শুল্ককর ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অসত্য ঘোষণায় শুল্ককর ফাঁকি, রেয়াতি সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করার অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে অনুরোধ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা। অপরদিকে একই অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ব্যাংক গ্যারান্টি অনুযায়ী একটি চালান এরই মধ্যে খালাস নিয়েছে এসিআই মোটরস লিমিটেড।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এসিআই মোটরসের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সুব্রত রঞ্জন দাস বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে বিষয়টি প্রসেসিং অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়ে কোম্পানির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এনবিআরের পুরোনো একটি আদেশের কারণে এমনটা হয়েছে। বিষয়টির সমাধান চেয়ে এনবিআরে আবেদন করা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com