সোমবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৭:১১ অপরাহ্ন

অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার প্রথম রাজধানী

অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার প্রথম রাজধানী

অযন্ত আর অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার প্রথম রাজধানী ‘পানাম নগরী’

এম এ বাবর ও সালাহ উদ্দিন টিটো:
অযন্ত আর অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে ঈশা খাঁর আমলে বাংলার প্রথম রাজধানী ‘পানাম নগরী’। এটি এক সময় ছিল বাণিজ্যিক শহরের প্রাণকেন্দ্র।

দেশ-বিদেশের বিখ্যাত বণিকদের মিলনমেলা বসত এখানে। হ্যাজাক লাইটের আলোকসজ্জা, হাজার হাজার মানুষের পদচারণা, নানা ভাষার কণ্ঠধ্বনিতে গমগম করত এ শহরটি।

তাছাড়া এখানেই বিখ্যাত মসলিন কাপড়ের জমজমাট বাণিজ্য চলত। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখানের বাড়িগুলো দিন দিন ধসে যাচ্ছে এবং সবগুলো বাড়িতে শ্যাওলা ধরেছে।

“হারিয়ে যাওয়া শহর” হিসাবে পরিচিত পানাম নগর বা পানাম সিটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পার্শবর্তী নারায়ণগঞ্জ জেলার 
মোগরাপাড়া পয়েন্টে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উত্তরে প্রায় ২.৫ কিলোমিটার অদূরে সোনারগাঁও থানার একটি নিকটতম শহর। 
পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি পানাম নগর। ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ড ২০০৬ সালে পানাম নগরকে বিশ্বের 
ধ্বংসপ্রায় ১০০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় প্রকাশ করে। বড় নগর, খাস নগর, পানাম নগর -প্রাচীন সোনারগাঁর এই 
তিন নগরের মধ্যে পানাম ছিলো সবচেয়ে আকর্ষণীয়। আজ থেকে প্রায় ৪৫০ বছর আগে বার ভূইয়ার দলপতি ঈশা খাঁ ১৫ 
শতকে বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেছিলেন সোনারগাঁওতে।সোনারগাঁর ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই নগরী গড়ে ওঠে

ঐতিহাসিক পানাম নগর:
১৫ শতকে ঈসা খাঁ বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেছিলেন সোনাগাঁওয়ে। ঈসা খাঁর যাতায়াত ছিল এই নগরীতে। সেই সময়টাতেই অর্থাৎ সুলতানি আমলে বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে। পূর্বে মেঘনা আর পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা নদীপথে বিলেত থেকে আসতো বিলাতি থানকাপড়, দেশ থেকে যেতো মসলিন।

শীতলক্ষ্যা আর মেঘনার ঘাটে প্রতিদিনই ভিড়তো বড় বড় পালতোলা নৌকা। প্রায় ঐ সময়েই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ইউরোপীয় অনুপ্রেরণায় নতুন ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতিতে গড়ে উঠে পানাম নগরী।

ইংরেজরা এখানে নীলের বাণিজ্যকেন্দ্র খুলে বসে। সেই সাথে মসলিনের বাজার দখল করে নেয় নীল বাণিজ্য।

পানামের অবকাঠামো:
পানাম নগরে ঢুকেই চোখে পড়বে একটি সরু রাস্তার ধারে সারি সারি পুরনো দালান। কোনটা দোতলা কোনটা আবার এক তলা। বাড়িগুলোর স্থাপত্য নিদর্শন দেখে বোঝা যায় এখানে ধনী বণিক শ্রেণীর লোকেরা বসবাস করতেন। বাড়ীগুলোতে মোঘল ও গ্রীক স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ দেখা যায় এবং প্রতিটি বাড়ির কারুকাজ স্বতন্ত্র। কারুকাজ, রঙের ব্যবহার এবং নির্মাণকৌশলের দিক থেকে নতুন নতুন উদ্ভাবনী কৌশলের প্রমাণ পাওয়া যায় এখানে। প্রায় প্রতিটি বাড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে ঢালাই লোহার তৈরি ব্রাকেট।

জানালায় ব্যবহার করা হয়েছে লোহার গ্রিল এবং ঘরে বায়ু চলাচলের জন্য ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল বাড়িগুলোতে কাস্ট আয়রনের নিখুঁত কাজ আছে, এবং ইউরোপে ব্যবহৃত কাস্ট আয়রনের কাজের সাথে এই কাজের অনেক মিল লক্ষ্য করা যায়।

এছাড়াও মেঝেতে লাল, সাদা, কালো মোজাইকের কারুকাজ লক্ষ্যনীয়। নগরীর ভিতরে আবাসিক ভবন ছাড়াও আছে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মঠ, গোসলখানা, নাচঘর, পান্থশালা, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, দরবার কক্ষ, গুপ্ত পথ, বিচারালয়, পুরনো জাদুঘর।

এছাড়া আছে ৪০০ বছরের পুরনো টাকশাল বাড়ি। পানাম নগরে টিকে থাকা বাড়িগুলোর মধ্যে ৫২টি বাড়ি উল্লেখযোগ্য। পানাম সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি আর দক্ষিণ পাশে ২১টি বাড়ি রয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়ি দুটি অংশে বিভক্ত। একটি বহির্বাটী এবং অন্যটি অন্দর-বাটি এবং বাড়ির সামনে উন্মুক্ত উঠান আছে। প্রতিটি বাড়ি পরস্পর থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থিত। নগরীর মাঝখান দিয়ে একটি সরু রাস্তা পানাম নগরীর ভেতর দিয়ে চলে গেছে।

এই রাস্তার দুপাশেই মূলত পানামের বাড়িগুলো তৈরি করা হয়েছে। পানাম নগরে ঢুকেই আপনি হারিয়ে যাবেন কোন এক অতীতে। এই শান্ত সুনিবিড় গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে এই ভবন গুলো। সংস্কারের অভাবে ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে লাগানো আছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। ভবনের জানালাগুলো ইটের গাঁথুনি দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পানাম পুলের কাছে দুলালপুর সড়কের খুব কাছেই রয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক তৈরিকৃত নীলকুঠি। নীল চাষের নির্মম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে পানামের নীলকুঠি।

নিরাপদ পানির জন্য প্রতিটি বাড়িতেই কুয়া বা কুপ ছিল। নিখুঁত পরিকল্পনা মাফিক পানাম নগর তৈরি করা হয়েছিল। পুরো নগরীতে যেন পানির কোন সমস্যা না হয় তাই নগরীতে পাঁচটি পুকুর ও নগরীর দুপাশে দুটি খাল কাটা হয়েছিল। নগরীতে যেন জলাবদ্ধতা না হয় সেই জন্য পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।

এছাড়া এখানে আছে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহীর শাসনামলে নির্মিত একটি মসজিদ। মসজিদটির নাম গোয়ালদী হোসেন শাহী মসজিদ। সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর থেকে পশ্চিম দিকে রয়েছে এই মসজিদ। মগরাপাড়া থেকে দক্ষিণ দিকে আরও কিছু ইমারত আছে যেমন বারো আউলিয়ার মাজার, হযরত শাহ ইব্রাহিম দানিশ মন্দা ও তার বংশধরদের মাজার, দমদম দূর্গ ইত্যাদি।

পানাম নগরে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন। ঈসা খাঁর ছেলে মুসা খাঁর প্রমোদ ভবন যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ফতেহ শাহের মাজার, সোনাকান্দা দুর্গ, পঞ্চপীরের মাজার, চিলেকোঠা সহ অসংখ্য পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন।

পানামের উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
পানাম নগরের সৌন্দর্যে অনেকে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তখন পারস্যের বিখ্যাত কবি ছিলেন কবি হাফিজ।

বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ কবিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কবি হাফিজ সেই আমন্ত্রণরক্ষা করতে পারেননি। তাই তিনি উপহার স্বরূপ একটি গজল লিখে পাঠিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ফরাসি একজন পর্যটক সোনারগাঁয়ে এসেছিলেন। তিনি পানাম নগর দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

 

যেভাবে ধ্বংস পানাম নগরী :
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় হিন্দু ব্যবসায়ীদের এই বসতি ছিল লুটেরাদের লক্ষ্যবস্তু। এ সময় বহু হিন্দু ব্যবসায়ী ভারতে পাড়ি জমালে পানাম প্রায় জনমানবহীন হয়ে পড়ে। সেই থেকে শুরু, তারপর থেকে আর জেগে ওঠেনি পানাম। এরপর কিছু বাড়ি দখল হয়ে যায়। কিছু বাড়িতে বসতি গড়ার জন্য অনুমতি দেয় সরকার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছু বাড়ি ইজারা দেওয়া হয়। মূল বাসিন্দাদের অবর্তমানে বাড়িগুলো অযত্নে ক্ষয়ে যেতে থাকে। দখলদারদের একজন ইয়ানুছ মাঝি (৮৫) দখল করেন একটি বাড়ি।

২০০৭ সালে অনেকের মতো তিনিও উচ্ছেদের শিকার হন। এখন তিনি পাশের খাগুটিয়া গ্রামে থাকেন। ইয়ানুছ মাঝির সঙ্গে কথা হয় পানাম সিটিতে। তিনি স্মৃতিচারণ করলেন অনেক কথার। হাত তুলে দেখালেন, যে বাড়ি দখল করে তিনি থেকেছেন এক সময়। বাড়ির কোন দিকে নদী ছিল। কোন পাশে ঘাট ছিল সবই বললেন।

পানাম নগরের মূল প্রবেশ পথের ছোট্ট খালটির উপরে একটি সেতু ছিল। যার কোনো অস্তিত্ব এখন নেই। অযত্ন আর অবহেলায় পানাম নগরের বাড়িঘরগুলোতে শ্যাওলা ধরেছে। বাড়িগুলোর দেওয়ালে গজাচ্ছে গাছপালা। ফলে বাড়িগুলোর ছাদ ধসে পড়তে পারে। এমনকি ২০০৫ সালে দুটো বাড়ি সম্পূর্ণ ধসেও পড়ে। জীর্ণ হলেও অধিকাংশ বাড়ি শতাব্দীর পর শতাব্দী দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়। একটি বাড়ির বিশাল নাচঘর এখনো টিকে আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী পানাম নগরের সৌন্দর্য অনেককে মুগ্ধ করেছে। পৃথিবীর বহু পর্যটক এসেছেন এই নগরে।

পানাম নগর দেখে তারা মুগ্ধ হয়েছেন। আবারও পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক বিলুপ্ত এই নগরী। ক্রমেই বেদখল হতে থাকা পানাম সিটি ২০০৬-০৭ সালে পুরোপুরি দখল উচ্ছেদ করে সরকার। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর পানাম সিটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৪ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয় পানাম সিটির ওপর দিয়ে যাওয়া যাতায়াতের রাস্তা। সিটির নিরাপত্তার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় ২০ সদস্যের আনসার টিমকে।

২০১৫ সালে টিকিট চালু করে দর্শনার্থীদের জন্য পানাম সিটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পানাম সিটির টিকিট ইনচার্জ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এটি দেশের অন্যতম প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনগুলোর একটি। পানাম সিটিকে পর্যটনবান্ধব করার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

আরও দেখুন:
সোনারগাঁয়ে পানাম নগর এবং লোকশিল্প জাদুঘর দুটোই পাশাপাশি। তাই সময় নিয়ে এলে এটিও দেখতে পারেন। ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে জাদুঘরে প্রবেশ করতে হবে। ফাউন্ডেশনের প্রবেশ পথেই একটি ভাস্কর্য আছে। একজন লোক গরুর গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। জাদুঘরের প্রবেশদ্বার সুন্দর কারুকাজ ও নকশায় সজ্জিত।

জাদুঘর ভবনের সমনে বিশাল একটি দিঘী আছে। তিনদিকে বাঁধানো ঘাট একপাশের ঘাটের দুইপাশে দুটি ঘোড়ায় সওয়ার সৈন্যের মূর্তি। ফাউন্ডেশনে (সোনারগাঁ জাদুঘর) দর্শনার্থীদের জন্য মোট ১১টি গ্যালারি রয়েছে।

প্রতিটি গ্যালারিতে দুর্লভ ঐতিহ্যের নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। গ্যালারিগুলো হল-নিপুণ কাঠ খোদাই গ্যালারি, মুখোশ গ্যালারি, নৌকার মডেল গ্যালারি, আদিবাসী গ্যালারি, লোকজ বাদ্যযন্ত ও পোড়া মাটির নিদর্শন গ্যালারি, তামা, কাঁসা, পিতলের তৈজসপত্র গ্যালারি, লোকজ অলঙ্কার গ্যালারি, বাঁশ, বেত, শীল পাটি গ্যালারি ও বিশেষ প্রদর্শনী গ্যালারি।

এছাড়া ফাউন্ডেশন ১৯৯৬ সালে আরো দুটি গ্যালারী স্থাপন করে। যার প্রথমটি কাঠের তৈরি প্রাচীন ও আধুনিককালের নিদর্শন দিয়ে সাজানো হয়েছে। আর অন্য গ্যালারীটি সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী জামদানি ও নকশিকাঁথা দিয়ে সাজানো হয়েছে। গ্রামবাংলার প্রায় সব কিছুই এই জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। নকশা করা কাঠের দরজা থেকে শুরু করে কাঠের সিন্ধুক, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, বিভিন্ন নৌকার ছোট আকৃতির মডেল, পোড়ামাটির পুতুল, পাথরের থালা, পোড়ামাটির নকশি ইট কি নেই সেখানে।

যেভাবে যাবেন:
গুলিস্তান থেকে স্বদেশ, বোরাক ও সোনারগাঁ নামক বাসে উঠে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় নামতে হবে। মোগরাপাড়া থেকে লোকশিল্প জাদুঘরের দূরত্ব প্রায় ২ কি.মি.। চাইলে রিক্সা অথবা সিএনজি তে করে যেতে পারেন। যদি তাড়াতাড়ি যেতে চান তাহলে সিএনজি নিয়ে নিন। তা নাহলে রিক্সাতে যাওয়াই ভাল। গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে রিক্সায় যেতে খারাপ লাগবেনা। তাছাড়াও নিজস্ব যানবাহন নিয়েও যেতে পারেন। জাদুঘরের সাথেই আছে পার্কিং স্থান। এখান থেকে পানাম নগর খুব কাছেই। চাইলে হেঁটেই যেতে পারবেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com