মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ০২:৫৪ অপরাহ্ন

থেলাসেমিয়ার কারণ ও চিকিৎসা

থেলাসেমিয়ার কারণ ও চিকিৎসা

ডাঃ মোঃ রুকুন উদ্দীন |

সারা বিশ্বের শিশু স্বাস্থ্যের এক আতংকের নাম থেলাসেমিয়া। এটি একটি প্রাণঘাতি রোগ। এর চিকিৎসা অত্যান্ত ব্যয়বহুল। ছেলে এবং মেয়ে উভয়েই এই রোগে আক্রান্ত হয়। প্রতি দশ হাজার জীবিত জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে প্রায় পাঁচজন শিশু থেলাসেমিয়া নিয়ে জন্মায়। তবে এশিয়া মহাদেশে এর সংখ্যা আরও বেশি।

থেলাসেমিয়া কি?
থেলাসেমিয়া হচ্ছে বংশগত বা জিনগত একটি রক্তরোগ, যেখানে রক্তের হিমোগ্লোবিনের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং ইহার গঠনগত ত্রুটি দেখা দেয়, RBC-র জীবনকাল কমে যায়, ফলে দেহে অক্সিজেনের অভাবজনিত বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দেয়। থেলাসেমিয়া সারা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত।
রোগের ধরণঃ থেলাসেমিয়া প্রধানত দুই প্রকার।

যথা-    ১) আলফা থেলাসেমিয়া ২) বিটা থেলাসেমিয়া।

রোগের কারণঃ
মৌলিক এবং আনুসঙ্গিক এই দুটি কারণে থেলাসেমিয়া হতে পারে।
১. মৌলিক কারণঃ সাইকেটিক এবং মিক্সড মায়াজম এর জন্য দায়ী।
২. আনুসঙ্গিক কারণঃ বংশগত বা জিনগত কারণে হাড়ের অভ্যন্তরীণ অস্বাভাবিক গঠনের ফলে মজ্জা থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ও সুস্থ হিমোগ্লোবিন বা লোহিত কণিকা উৎপাদন না হওয়া, এদের গড় আয়ু কমে যাওয়া। যে স্বামী ও স্ত্রীর উভয়ের রক্ত স্বল্পতা রয়েছে তাদের শিশু, যারা রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বিয়ে করেন তাদের শিশু, গর্ভবতী অবস্থায় মায়ের উচ্চ ডায়াবেটিস থাকিলে, বাবা ও মায়ে থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা থাকিলে।
শিশু গর্ভে থাকাকালীন সময়ে মাত্রারিক্ত এক্স-রে এবং আলট্রাসনোগ্রাফী বা আলট্রাভায়োলেট রশ্মির ব্যবহার বা ক্যামো থেরাপী গ্রহণ করলে গর্ভের শিশু থেলাসেমিয়া নিয়ে জন্মাতে পারে।

লক্ষণসমূহঃ
সাধারণত ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর থেলাসেমিয়ার লক্ষণ অস্পষ্ট বা বুঝা যায় না, তবে অনধিক ২ বৎসর বয়সের মধ্যেই লক্ষণ প্রকাশ পায়। অতিরিক্ত রক্ত স্বল্পতা দেখা দেয়, দেহের ত্বক হলুদাভ বা ফ্যাাকশে দেখায়, শিশু দুর্বল, গায়ে জ্বর, গলা ব্যাথা, বুকে ব্যাথা, হাত-পা ঠান্ডা, শ্বাসকষ্ট, স্মরণশক্তি কম, মেজাজ খিটখিটে, হাতে-পায়ে চাবানো-কামড়ানো ব্যাথা, হার্টের গতি দ্রুত, খাবারে অরুচি, মাটি, চক বা অখাদ্য খাওয়ার অভ্যাস, মাথা ব্যাথা, মাথা ঘোরা, মাথার খুলির গঠনে অস্বাভাবিকতা, বয়স অনুযায়ী শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি না হওয়া, দেহে অতিরিক্ত আয়রন জমা হওয়ার ফলে প্লীহা, হৃৎপিন্ড আকারে বড় হয়ে যায়, পিত্তথলীতে পাথর জমে, প্রস্রাব কালো বর্ণের বা ঘোলা বর্ণের হয়, কাজে ও খেলাধুলায় উৎসাহহীনতা এবং সহজেই অসুস্থ হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষাঃ
অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, নিখুঁত পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ নির্ণয় করতে হবে, অন্যথায় সাধারণ রক্ত স্বল্পতা মনে করে আয়রন জাতীয় ঔষধ সেবন করতে থাকলে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যায়। রক্তের হিমোগ্লোবিন প্রোফাইল, ডি.এন.এ টেষ্ট, রক্তের সিরাম পরীক্ষায় অতিরিক্ত আয়রন পাওয়া যায় এবং আলট্রাসনোগ্রাম করলে স্পিন, লিভার, হার্ট বড় দেখায়।

থেলাসেমিয়া প্রতিরোধঃ বাবা-মায়ের সম্পূর্ণ রোগমুক্ত অবস্থায় বাচ্চা নিতে হবে, ছেলে-মেয়ের বিয়ের পূর্বে তাদের রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করতে হবে, আত্মীয়তা অর্থাৎ রক্তের সম্পর্ক রয়েছে এমন কারও সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যাবে না, গর্ভবতী মায়ের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে হবে, গর্ভবতী অবস্থায় অতিমাত্রায় এক্স-রে এবং আলট্রাসনোগ্রাফী করা যাবে না এবং ক্যামোথেরাপী নেওয়া যাবে না। গর্ভকালীন সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং ফলিক এসিডসহ সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে থেলাসেমিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।

চিকিৎসাঃ করণীয়
করণীয়ঃ রোগীকে সম্পূর্ণরূপে বিশ্রামে থাকতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ সুষম খাদ্য, ফলিক এসিড, ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম, টাটকা ফলমূল ও শাক-সবজি নিয়মিত খেতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। সকল প্রকার আয়রন জাতীয় ঔষধ এবং খাবার বন্ধ করতে হবে। দেহে জমাকৃত আয়রন যেন জমাট বাধতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

রোগীর বসবাসের ঘর হতে হবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসযুক্ত, একটু খোলামেলা। রোগীকে সকল প্রকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

লেখক- ডাঃ মোঃ রুকুন উদ্দীন
প্রভাষক, উত্তরা হোমিওপ্যথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
চীফ কনসালটেন্ট, হোমিও হীলিং পয়েন্ট
মিরপুর-১১, ঢাকা
মোবাইলঃ ০১৭১৮৪১২৮৯২

 


© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com