সোমবার, ২৫ মে ২০২০, ১০:২৭ পূর্বাহ্ন

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও একজন শফিকুল ইসলাম

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও একজন শফিকুল ইসলাম

বিশেষ প্রতিনিধি, আজকাল, ঢাকা: 

নিজের কর্মে মনোযোগ দেয়ার পাশাপাশি জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে দীর্ঘ ১৭ বছর ধুমপান বিরোধী আন্দোলন করে যাচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বাড্ডা থানায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে কর্মরত আছেন।

নিজেকে ধুমপানমুক্ত করে ২০০৩ সালে ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ নামক এ ব্যাতিক্রম আন্দোলন শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তার সংগঠনে সদস্য সংখ্যা প্রায় অর্ধলক্ষ। ঢাকা সহ সারা দেশের জেলায় ও উপজেলায় রয়েছে সংগঠনের কমিটি। তাছাড়া বিশ্বের ২৪টি দেশেও রয়েছে ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ এর শাখা। এই সংগঠনের উপদেষ্টা পদে রয়েছেন, কিছু সংখ্যক বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাসহ সাংবাদিক, পুলিশ, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশার প্রায় তিনশ’ জন ব্যক্তি । অন্যদিকে ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’-এর ফেসবুকে পেজে ফলোয়ার দুই কোটির বেশি মানুষ।

তরুন প্রজন্ম তথা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশে পুলিশের এই কর্মকর্তা বললেন, আমাদের সকলকে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা হতে হবে। নইলে একটি সুস্থ্য সমাজ গড়া সম্ভম নয়। তাছাড়া, মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সর্বস্তরের মানুষের কাছে এর কুফল গুলো তুলে ধারা ছাড়া বিকল্প নেই। তাই সমাজ ও দেশটাই সবার আগে রেখেই আমি ধুমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বিভিন্ন প্রচার প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছি।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, ১৯৯১ সালে কলেজে লেখাপড়া করা অবস্থায় আমি ধূমপান করতাম। এরপর ১৯৯২ সালের দিকে আমার নানা রকম শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। গলা ব্যথা, কাশিসহ নানা রকমের সমস্যা অনুভব করে আমি ধূমপানটা ছেড়ে দেই। তখন আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, যেভাবেই পারি মানুষকে ধূমপান থেকে বিরত রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাব। আর একদিন বাংলাদেশকে ধূমপানমুক্ত দেশ হিসেবে দেখব।

১৯৯৬ সালে আমি পুলিশের চাকরিতে যোগদান করার পরে থেকেই ভাবতে থাকি কীভাবে মানুষকে ধূমপান থেকে বিরত রাখার কাজটা শুরু করা যায়। কিন্তু শুরু করার সাহস কিংবা অনুপ্রেরণাটা পাচ্ছিলাম না। তবে আমি সিএমপিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৯৮ সালের দিকে একটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছিল। চট্টগ্রামে রাঙ্গামাটি জেলার তৎকালীন জেলা প্রশাসকের (ডিসি) রুমে এক ব্যক্তি হঠাৎ ঢুকে ডিসি সাহেবকে পিস্তল ঠেকিয়েছিল। তাকে জিম্মি করে ওই ব্যক্তি বলেছিল, ‘আপনি সারা দেশে ধূমপান বন্ধ করার ব্যবস্থা করুন। এরপর প্রশাসনের সহযোগিতায় তাকে আটক করা হয় এবং ডিসিকে উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনার পর আমি একটি শিক্ষা পেয়ে গেলাম যে, বাংলাদেশে ধূমপানমুক্ত একটি আন্দোলন করা যায়। তবে সেটা ওই ব্যক্তির মতো কাউকে পিস্তল ঠেকিয়ে বা জিম্মি করে নয়। এরপর আমি সর্বসাধারণ মানুষের কাছে যেতে শুরু করলাম।

যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করে সংগঠনটি:

ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই সংগঠনের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে- পোস্টার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও চায়ের দোকানে সভা-সেমিনার। এছাড়া সারা দেশের উপজেলা, থানা ও জেলায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা মানুষকে সচেতন করার জন্য কাজ করছেন। এ ক্ষেত্রে কারো ওপর বলপ্রয়োগ করা হয় না। এমনকি সদস্যদের মধ্যে কেউ ধূমপান করেন কি-না? তার জন্যও রয়েছে মনিটরিং সেল। সদস্যদের মধ্যে কেউ ধূমপান করলে তার সদস্যপদ বাতিল করা হয়। এপর্যন্ত ২০০শ’রও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তারা সচেতনতামূলক সেমিনার করেছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অগ্রগতিতে শফিকের এ আন্দোলন যুক্ত হয় ফেসবুকে। তৈরি করা হয় ফেসবুক গ্রুপ। ২০১৪ সাল থেকে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে প্রচারণা চলতে থাকে। ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ নামের ফেসবুক পেজে শফিকুল ইসলাম প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে পেজের মূল অ্যাডমিন। এছাড়াও ৯ জন অ্যাডমিন রয়েছেন।

ধূমপান ছাড়াতে যেভাবে কাউন্সিলিং করানো হয়:

শফিক বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আমরা বিভিন্ন পদ্ধতিতে বোঝানোর চেষ্টা করি। অনেককে বিভিন্ন যুক্তি ও কৌশল উপস্থাপন করে বোঝানোর চেষ্টা করি। আমরা মধ্যবিত্তদের বোঝাই, যদি তারা ধূমপান ছেড়ে দেয়, তবে তারা অনেক দিক থেকেই জিতে যাব। আমরা এটাকে এভাবে বলি, আমার পরিবারের মধ্য থেকে আমি যদি ধূমপান ছেড়ে দেই, তবে প্রথমে আমি হব অর্থমন্ত্রী। কারণ আমি প্রতিদিন ধূমপানের পেছনে যে ৫০ টাকা ব্যয় করি, যদি ধূমপান ছেড়ে দেই, তবে আমার ৫০ টাকা আয় থাকবে প্রতিদিন।

আর দ্বিতীয়ত আমি হব একজন পরিকল্পনামন্ত্রী। কারণ আমার কাছে যখন ৫০ টাকা প্রতিদিন বেঁচে যাবে, তখন আমি একটা পরিকল্পনা করব যে এই ৫০ টাকা দিয়ে আমি কী করতে পারি। জামা কিনব না জুতা কিনব, নাকি আমার বাচ্চার দুধ কিনব ইত্যাদি। আর তৃতীয় আমি হব একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কারণ আমি আমার এবং আমার পরিবারের মানুষের সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছি। এই থিউরিটা নিয়ে আমি বেশ কিছু এলাকায় প্রোগ্রাম করেছি। আমি ইউআইইউ ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ২০ জন ছাত্র নিয়ে এবং শিক্ষকদের সঙ্গে সেমিনার করেছি।

এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আমি অনেক স্যারের কাছে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করেছি, স্যার আপনি কি সুস্থ আছেন? তখন ওই স্যাররা বলত, হ্যাঁ। আমি সুস্থ আছি। তখন আমি বলতাম, স্যার আমার মনে হয় আপনি সুস্থ নেই। কারণ আপানকে যদি পাঁচ তলা থেকে লাফ দিতে বলা হয়; তবে কি আপনি দিবেন? তখন উত্তরে ওই স্যার বলেন, না, ওখান থেকে পড়লে তো মারা যাব।

তখন আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, স্যার পাঁচ তলার ছাদে বা কোনো বিল্ডিংয়ের ওপরে তো লেখা নাই যে এখান থেকে পড়ে গেলে আপনি মারা যাবেন। এমন কি লেখা আছে? স্যার তখন উত্তর দেন না। কারণ সেটা কোথাও লেখা নাই। আপনি কি কাউকে পাঁচ তলা থেকে পড়ে সরাসরি মরতে দেখেছেন? স্যার উত্তর দেন, না চোখের সামনে এমন ঘটনা দেখিনি, তবে শুনেছি। আর আমার নিজস্ব জ্ঞান দিয়েও তো এটা স্পষ্ট বুঝতে পারি যে পাঁচ তলা বা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে গেলে মারা যাব।

আমি তখন তাকে বলি, স্যার, আপনার এত জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে আপনি এই বিষয়ে খুব বেশি সচেতন আছেন। কিন্তু সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে যে সরাসরি লেখা থাকে, ধূমপান মৃত্যুর কারণ। ধূমপান মৃত্যু ঘটায়। সেটা আপনি জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করেও কেন খাচ্ছেন? তখন ওই স্যার আর কোনো উত্তর দিতে পারেননি। কারণ তার কাছে কোনো উত্তর নেই। এরপর আমি আবার অনেক স্যারকে জিজ্ঞাসা করি, স্যার যদি কোনো সুন্দর একটা বাথরুমে আপনাকে ঢুকে দেয়া হয়, সবকিছু চকচকে, সেখানে কোনো ময়লা বা দুর্গন্ধও নেই।

এরপর যদি পুরান ঢাকা থেকে একটা স্পেশাল হাজির বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে গিয়ে আপানকে সেখানে খেতে দিতে হয়, তবে আপনি কি তা খাবেন? স্যার তখন উত্তর দেন, না আমি খাব না। কারণ বাথরুমের ভেতরে খাওয়া যায় না। আমি তখন বললাম, স্যার এটা যে বাথরুম সেটা কীভাবে বুঝলেন? তখন স্যার উত্তর দিলেন, প্রবেশের সময় দরজায় লেখা দেখেছি।

আচ্ছা স্যার, এই বাথরুমে এখন যদি একটা ১২ টাকার বেনসন সিগারেট ও একটা ম্যাচ দেওয়া হয়। তবে কি আপনি সেটা খাবেন? তখন স্যার একটা মুচকি হাসি দিলেন। আমি তাকে বললাম, স্যার এখন বলেন, আপনি কি আসলে সত্যি সুস্থ আছেন? এভাবেই আমরা মানুষদের বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক দিয়ে ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো বোঝানোর চেষ্টা করি। তাতে কেউ জেনে-বুঝে সজ্ঞানে ধূমপান ছেড়ে দেয়, আবার কেউ জেনে-বুঝেও ছাড়তে পারে না।

যারা ধূমপান ছেড়ে দেবেন, তারাই আমার বন্ধু হবেন:

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সিএমপি থেকে বদলি হয়ে ২০০৪ সালে ঢাকায় র‌্যাবে এসে যোগদান করি। র‌্যাবে আসার পরে আমি উত্তরখান, দক্ষিণখান এলাকায় র‌্যাবের পোশাক পরে গিয়ে অনেক মানুষকে বলতাম ধূমপান ছেড়ে দিতে। তবে আমি কিন্তু কাউকে কোনোদিন জোর করিনি। আমি মানুষকে এমনও বলেছিলাম, ভাই আপনারা যদি ধূমপান ছেড়ে দেন তবে আমি প্রতিদিন আপনার কাছে আসব। আমার একটাই উদ্দেশ্য, আপনারা আমার বন্ধু হবেন। যারা ধূমপান ছেড়ে দেবেন, তারাই আমার বন্ধু হতে পারবেন। তখন অনেকে আমার কথা শুনে ধূমপান ছেড়ে দিত। আর যারা ধূমপান ছেড়ে দিত তখন থেকেই আমি খাতা-কলমে তাদের আমার সদস্য করে নেওয়া শুরু করলাম।

সংগঠনের প্রথম সদস্য শফিকের স্ত্রী:

শফিকুল ইসলাম বলেন, ২০০৪ সালে আমি আমার সংগঠনের নাম দিলাম “ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই”। আমি আমার একটা ব্যক্তিগত ডায়েরিতে সদস্যদের নাম লেখা শুরু করলাম। আমার স্ত্রী হলো এই সংগঠনের প্রথম বা এক নম্বর সদস্য। তাকে দিয়েই শুরু করলাম। আমি হলাম এর চেয়ারম্যান। প্রথমে আমি চাকরির ফাঁকে বিভিন্ন স্কুলে যেতাম। সেখানে গিয়ে আমি ছাত্রছাত্রীদের বোঝাতাম। কারণ আমি একসময়ে ছাত্র জীবনে স্কুলে শিক্ষকতা করতাম। এর জন্য বিষয়টি আমার কাছে কিছুটা সহজ ছিল। তিনি বলেন, আমি ছাত্র-ছাত্রীদের বলতাম, ছোট ভাই, তোমরা ধূমপান করবে না। এভাবে আমি এই পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সেমিনার করেছি। এরপর আমি যখন এটা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করলাম। তখন আমি আমার র‌্যাবের সিনিয়র অফিসারদের কাছে ধীরে ধীরে যেতে শুরু করলাম। এভাবেই যখন র‌্যাব থেকে আবারও পুলিশের ফেরত এসেছি। দেশের বিভিন্ন থানায় ডিউটি করেছি। তাই যখন যেখানে যেতাম; তখন সেখানেই আমার কাজ আমি চালিয়ে যেতাম।

শফিকুল ইসলামের পরিচিতি:

শফিকুলের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার কাদৈর গ্রামে। বাবা তোফাজ্জল হোসেন ও মা মহারানী বেগম— দুজনই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে শফিকুল তৃতীয়। ১৯৯৬ সালের ১ মার্চ চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) একজন কনস্টেবল হিসেবে যোগদান করেন। এরপর চাকরির পাশাপাশি রাজধানীর সরকারি কবি নজরুল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে বর্তামানে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে কর্মরত আছেন। পারিবারিক জীবেন তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলের পিতা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Add

© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com