মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২০, ০৮:৩২ অপরাহ্ন

পিডিবিকে ৫০০ কোটি টাকা দেওয়ার নির্দেশ!

পিডিবিকে ৫০০ কোটি টাকা দেওয়ার নির্দেশ!

ইসমাইল আলী:

স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে নিতে আইন করেছে সরকার। গত ৫ ফেব্রুয়ারি এ আইন পাস করা হয়। আইনটি পাস হওয়ার পরই বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার অর্থ সংগ্রহে মরিয়া হয়ে উঠেছে সরকার। এরই মধ্যে বিভিন্ন সংস্থায় চিঠি দিয়ে অর্থ চাওয়া হয়েছে।

সূত্রমতে, অর্থ সংগ্রহের এ প্রক্রিয়া থেকে বাদ যাচ্ছে না রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি সংস্থাগুলোও। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) তিন দিনের মধ্যে ৫০০ কোটি টাকা জমা দিতে বলেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

যদিও পিডিবি অন্যতম লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। গত অর্থবছর পিডিবির লোকসান ছিল আট হাজার ১৪১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। সংস্থাটির ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লোকসান। এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৩১০ কোটি ১৫ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছিল পিডিবি। আর গত ৯ বছরে সংস্থাটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ২১০ কোটি ২০ লাখ টাকা। এছাড়া গত অর্থবছর পিডিবিকে ভর্তুকি দেওয়া হয় সাত হাজার ৯৬৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

এ অবস্থার মধ্যেই পিডিবিকে দুই হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। এর মধ্যে প্রথম কিস্তি হিসেবে তিন দিনের মধ্যে ৫০০ কোটি টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে। যদিও চলতি অর্থবছর সংস্থাটির ঘাটতি রয়েছে পাঁচ হাজার ৪৪৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

বলা হচ্ছে, সরকারের ব্যাংকঋণের ভার অনেক বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের স্বশাসিত সংস্থাগুলোর স্থিতিতে থাকা দুই লাখ ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা উন্নয়নের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা থেকে আইন করা হয়েছে। এজন্য আইন পাস হওয়ার ১০ দিনের মাথায় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ নিতে কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ৬১টি সংস্থায় সম্পদের হিসাব চেয়ে চিঠি দেয়।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি কমিটি গঠনসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। চার সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে (ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা)। আর সদস্য সচিব করা হয়েছে অর্থ বিভাগের নগদ ও প্রচ্ছন্ন দায় ব্যবস্থাপনা অধিশাখার উপসচিবকে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব (বাজেট ১) ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (মনিটরিং সেল)।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের নগদ ও প্রচ্ছন্ন দায় অধিশাখা থেকে জারি করা এ প্রজ্ঞাপনে কমিটির কার্যপরিধিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑআইনের তফসিলে বর্ণিত (৬১) সংস্থার বিগত পাঁচ বছরের নিরীক্ষিত হিসাব বিবরণী ও হালনাগাদ ব্যাংক হিসাব বিবরণী এবং সংস্থাগুলোর চলমান ও পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা সংগ্রহপূর্বক বছরভিত্তিক ব্যয়ের হিসাব পরীক্ষা করা। পাশাপাশি ৬১টি সংস্থার পেনশন ও ভবিষ্যৎ তহবিলের হিসাব সংগ্রহ করা। এছাড়া সংস্থাগুলোর তহবিলে উদ্বৃত্ত অর্থের হিসাবসহ সংস্থাভিত্তিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে ওই কমিটি। সংস্থাভিত্তিক এ হিসাব বিবরণী অর্থ সচিবের কাছে উপস্থাপন করা হবে।

যদিও কোনো ধরনের হিসাব-নিকাশ ছাড়াই দ্রুত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর অর্থ নিতে উদ্যোগী হয়ে উঠেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এজন্য গত ১০ মার্চ পিডিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের গঠিত ওই কমিটি। ওই সভায় জানানো হয়, পিডিবির স্বল্পমেয়াদি স্থায়ী হিসাবে রক্ষিত আমানত আছে সাত হাজার ১৪১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ও এসটিডি আছে পাঁচ হাজার ৩৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট জমা ১২ হাজার ১৭৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

এদিকে আদায়কৃত বিল থেকে পিডিবিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিলে জমা দিতে হবে পাঁচ হাজার ১০৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। আর পেনশন তহবিলে দুই হাজার ২২১ কোটি ১৯ লাখ টাকা ও জিপিএফ তহবিলে ৪১০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা দরকার। অর্থাৎ তিন তহবিলের আকার সাত হাজার ৭৩৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। আর চলতি অর্থবছর পিডিবির সম্ভাব্য পরিচালনা ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এর ২৫ শতাংশ বা ৯ হাজার ৮৮৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা নিজস্ব তহবিল থেকে নির্বাহ করতে হবে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছর পিডিবির দরকার হবে ১৭ হাজার ৬২৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এতে ঘাটতি দাঁড়াবে পাঁচ হাজার ৪৪৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

যদিও ঘাটতির বিষয়টি আমলে না নিয়েই ১২ মার্চ চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, ‘স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনহ স্বশাসিত সংস্থাসমূহের তহবিলে জমাকৃত উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান আইন, ২০২০-এর ধারা ৪ ও ৫-এর বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ হিসাবে আপাতত চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২০০০ কোটি টাকার মধ্যে ৫০০ কোটি টাকা ১৫ মার্চ ২০২০ তারিখের মধ্যে নির্ধারিত কোডে চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

জানতে চাইলে পিডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পিডিবি একটি লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। তাই প্রতি বছর ভর্তুকি দিতে হয় এ সংস্থাটিতে। এ অর্থবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এছাড়া পিডিবির নিজস্ব চাহিদা পূরণে চলতি অর্থবছর প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে কোনো ধরনের হিসাব-নিকাশ ছাড়া দুই হাজার কোটি টাকা দিতে বলা হয়েছে, যা হতাশাজনক। আর তিন দিনেই দিতে হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে বোর্ড সভা আহ্বান করা হয়। এক্ষেত্রে বৈঠকের কার্যবিবরণী জারির অপেক্ষা না করে বাই সাকুলেনের মাধ্যমে এ অর্থ প্রদান করতে হয়েছে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Add

© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com