শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২০, ০২:৩৩ অপরাহ্ন

বাতিল হচ্ছে বিমানবন্দর মহাখালী বিআরটি নির্মাণ!

বাতিল হচ্ছে বিমানবন্দর মহাখালী বিআরটি নির্মাণ!

ইসমাইল আলী: 

রাজধানীর প্রবেশপথের যানজট নিরসনে গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণ করছে সরকার। পরবর্তী সময়ে তা বিমানবন্দর থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে নির্মাণ করার কথা ছিল বিমানবন্দর থেকে মহাখালী পর্যন্ত অংশটি। এ প্রকল্পটি অর্থায়নে আগ্রহী বিশ্বব্যাংক। যদিও বর্তমানে প্রকল্পটি ঝুলে গেছে।

সূত্র জানায়, বিমানবন্দর-কেরানীগঞ্জ বিআরটির সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা চূড়ান্ত করা হয় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে। নির্মল বায়ু টেকসই পরিবেশ (কেস) প্রকল্পের অধীনে এ নকশা করা হয়। তবে এ রুটে থাকা একাধিক ফ্লাইওভারের কারণে তিন ধাপে বিআরটি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।

প্রথম ধাপে বিমানবন্দর থেকে মহাখালী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত বিআরটি নির্মাণ করার কথা ছিল। আর সেখান থেকে দুই রুটে ফিডার বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। একটি ফিডার বাস মহাখালী থেকে ফার্মগেট ও অপরটি মহাখালী থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত চলাচল করবে। পরবর্তী পর্যায়ে মহাখালী থেকে গুলিস্তান ও শেষ পর্যায়ে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিআরটি চালু করা হবে।

তথ্যমতে, প্রথম অংশের আওতায় ছিল বিমানবন্দর থেকে মহাখালী পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার বিআরটি লেন নির্মাণ। পাশাপাশি মহাখালীতে দুই কিলোমিটার ফ্লাইওভার, যাত্রী ওঠানামায় পাঁচটি বিআরটি স্টেশন, ফুটপাত, পদচারী সেতু, আন্ডারপাস ও কেরানীগঞ্জে বাস ডিপো নির্মাণ। এছাড়া ১৫০ জন যাত্রী ধারণক্ষমতার ৯১টি বাস সংগ্রহ ও স্বয়ংক্রিয় ভাড়া সংগ্রহ প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা করার কথা ছিল প্রথম পর্যায়ে। এর বাইরে মহাখালীতে একটি মাল্টিমোডাল বহুতল বাস টার্মিনাল নির্মাণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও বিদ্যমান বাসগুলোকে সমন্বিতভাবে একটি বা দুটি কোম্পানিতে রূপান্তর করার কথা ছিল প্রকল্পের আওতায়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়। এরই অংশ একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্পও অনুমোদন করা হয়েছে, যা বর্তমানে চলমান। তবে এখন বিমানবন্দর থেকে মহাখালী পর্যন্ত বিআরটি নির্মাণ পরিকল্পনা স্থগিত করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। এক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি নির্মাণ করতে গিয়ে বিমানবন্দর সড়কে প্রচণ্ড যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। তাই বিআরটি সম্প্রসারণ করতে গেলে তা রাজধানীতে আরও জটিলতা তৈরি করবে।

যদিও প্রকল্পটিতে অর্থায়নে এখনও আগ্রহী বিশ্বব্যাংক। এজন্য সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কিছুদিন আগে সাক্ষাৎ করেন বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি এম টিমবন। এতেও ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মার্সি এম টিমবন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৫ আল মামুন মুর্শেদ স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে বলা হয়, “গত ২৭ জানুয়ারি বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিশ্বব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট ‘এক্সপানশন অব বিআরটি টুয়ার্ডস সাউথ টু ঢাকা সিটি’ শীর্ষক প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে অবহিত করেন। এ অবস্থায় উল্লিখিত প্রকল্পের বিষয়ে একটি অবস্থানপত্র আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে পাঠানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”

জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের কোনো চিঠি এখনও পায়নি। তবে বিশ্বব্যাংকের অর্থ না নেওয়া বা প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে বিমানবন্দর থেকে মহাখালী পর্যন্ত বিআরটি সম্প্রসারণ করা হবে না বলে আপাতত মন্ত্রী মহোদয়ের অবস্থান। কারণ গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বিআরটি নির্মাণ করতে গিয়েই বিমানবন্দর সড়কে প্রচুর যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এখন আবার বিমানবন্দর-মহাখালী অংশে যানজট সৃষ্টির কোনো ইচ্ছে নেই।

যদিও বিমানবন্দর-মহাখালী অংশের বিআরটি বাস্তবায়ন না হলে গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশটির উপযোগিতা নষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিআরটিতে সহজেই যাত্রীরা গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে পারবে। তবে এরপর রাজধানীর ভেতর ঢোকার কোনো উপায় নেই। তখন তাদের আবার লোকাল বাস ব্যবহার করতে হবে। একইভাবে আবার গুলিস্তান, ফার্মগেট বা মহাখালীর যাত্রীরা বিমানবন্দর পর্যন্ত লোকাল বাসে গিয়ে আবার বিআরটিতে উঠবেন, সেটাও অযৌক্তিক চিন্তা। তাই বিমানবন্দর-মহাখালী অংশ অবশ্যই দরকার।

তারা আরও বলেন, ঢাকার যানজট অস্বাভাবিক বাড়ায় গাড়ির গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ছয়-সাত কিলোমিটারে নেমে গেছে। এর চেয়ে খারাপ অবস্থা আর কী হতে পারে। বরং বিআরটি নির্মাণ সম্পন্ন হলে যে উপকার পাওয়া যাবে, তা মাথায় রেখে প্রকল্পটি অবশ্যই বাস্তবায়ন করা উচিত।

এ বিষয়ে মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিআরটি নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংক দেন-দরবার করছে। এটি নির্মাণ না করা হলে কী সমস্যা হবে তারা আমাদের জানিয়েছে। আগামীতে আবারও তারা বৈঠক করতে চেয়েছে। যদি তারা মন্ত্রীকে কনভেন্স করতে পারে, তবে প্রকল্পটি হতে পারে। তবে আপাতত এ বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই।’

উল্লেখ্য, বিমানবন্দর-কেরানীগঞ্জ রুটে বিআরটি নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিমানবন্দর থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত রুটে দৈনিক সাড়ে ছয় লাখ মানুষ যাতায়াত করে। অনিয়ন্ত্রিত বাস রুটের কারণে এতে যানজট লেগেই থাকে। তাই এ রুটে বিআরটি নির্মাণ করা জরুরি। আর এ প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল চার হাজার ৭৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

২০ কিলোমিটার এ রুটে বাস স্টপেজ হওয়ার কথা ১৬টি। এগুলো হলো খিলক্ষেত, কুড়িল, ক্যান্টনমেন্ট, কাকলী, আমতলী, মহাখালী বাস টার্মিনাল স্টেশন, বিজি প্রেস, মগবাজার, বেইলি রোড, কাকরাইল, পল্টন, গুলিস্তান, স্টেডিয়াম, নয়াবাজার, কদমতলী ও কেরানীগঞ্জ। এর মধ্যে আমতলী ও মহাখালী স্টপেজ হবে উড়ালপথে (এলিভেটেড)। বাকিগুলো হবে ভূমির সমতলে।

প্রসঙ্গত, বাস চলাচলের পৃথক তথা ডেডিকেটেড লেন ব্যবস্থা হলো বিআরটি। পার্শ^বর্তী দেশ ভারত ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যানজট নিরসনে এ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান সড়কের দুই পাশে ডিভাইডার (সড়ক বিভাজক) দিয়ে বাসের জন্য পৃথক লেন করা হয়। আর বাসে ওঠানামার জন্য কিছু স্টপেজ তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রে ভূমি থেকে দুই-তিন ফুট উঁচুতে ছাউনির ব্যবস্থা করতে হয়। বাস স্টপেজের সামনে থামার পর সোজা হেঁটে তাতে উঠে যান যাত্রীরা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Add

© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com