সোমবার, ২০ জানুয়ারী ২০২০, ০৬:২৭ পূর্বাহ্ন

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ফিল্ড হাসপাতাল

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ফিল্ড হাসপাতাল

ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী: 

বহু মনীষী পৃথিবীকে স্বর্গে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেছেন যুগে যুগে। লেনিন নামে খ্যাত ভ্লাদিমির ইলিচ উলিনভ তাদের অন্যতম।

পুঁজিবাদী বিশ্বে ১৮৯৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছর আলফ্রেড নোবেল পুরস্কার তহবিল সৃষ্টি করেছিলেন বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও কবি-সাহিত্যিকদের সম্মানিত করার জন্য। এই একই বছর রাশান ফার্মেসি সোসাইটি স্থাপিত হয়।

১৮৯৫ সাল পৃথিবীর পরিবর্তনের সূচনার বছর। সেন্ট পিটার্সবার্গে শ্রমিকদের সংঘটিত করে লিগ অব স্ট্রাগলের মাধ্যমে আন্দোলন এবং দার্শনিক প্লেখানভের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে ডিসেম্বর ১৮৯৫-তে লেনিন গ্রেফতার হন।

ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী:

শাস্তি হিসেবে আইনের ছাত্র লেনিন ফেব্রুয়ারি ১৮৯৭ পর্যন্ত এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং পরে আরো তিন বছর নির্জন বাসের দণ্ড ভোগ করলেন সাইবেরিয়ায়। দণ্ড শেষে ১৯০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেনিন ফিরে এলেন সেন্ট পিটার্সবার্গে। নির্বাসনকালে লিখলেন ‘The Development of Capitalism in Russia’ and ‘The Tasks of the Russian Social Democrats’. যা অচিরে সব বিপ্লবীর পাঠ্যপুস্তকে পরিণত হয়।

স্মরণ প্রয়োজন যে, জার সম্রাটকে হত্যার পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে লেনিনের বড় ভাই আলেকজান্ডার ইলিচ উলিনভের ফাঁসি হয়েছিল ১৮৮৭ সালের ২০ মার্চ। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে আলেকজান্ডার উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বিপ্লব অনিবার্য।

আমি মৃত্যু আলিঙ্গনে ভীত নই।’ জারের পুলিশের নজর এড়িয়ে এবং ইউরোপের শিল্প বিপ্লবকে সম্যকভাবে জেনে রাশিয়ার কৃষক-শ্রমিকদের সংগঠিত করে বিপ্লবের চারণভূমি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ১৯০০ সালের এপ্রিলে গোপনে লেনিন যাত্রা করলেন ফিনল্যান্ড ও জার্মানি হয়ে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে।

শিল্প বিপ্লবের প্রাক্কালে, ওই একই বছর সুইজারল্যান্ডের শিল্পনগরী বাসেল শহরে জন্ম নেয় ভবিষ্যতের ফার্মাসিউটিক্যালস দানব সিবা (Ciba)। বাসেলে আরো রয়েছে ডাচ দার্শনিক এরাসমাসের সমাধি।

সিবা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫০ সালে সিল্কে রঙ করার রাসায়নিক দ্রব্যাদি উৎপাদনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে। ১৯০০ সালে সিবা ফার্মাসিউটিক্যালস উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু করে। ১৯৭০ সালে সিবার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেক রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান জি আর গেইগি।

গেইগির গবেষক পল মুলার মশা নিরোধক ডিডিটি (Dichloro diphenyl trichlorethane : DDT) আবিষ্কারের জন্য ১৯৪৮ সালে ‘নোবেল পুরস্কার’ পেয়েছিলেন। ক্যান্সার সৃষ্টিতে সহায়তা করে বিধায় বাংলাদেশসহ ৪৯টি দেশে ডিডিটি ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং অন্য ২৩টি দেশে সীমিত ব্যবহারের অনুমতি আছে।

১৯৯৬ সালে সিবাগেইগির সঙ্গে একীভূত হয় পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি নোভারটিস এবং সুইজারল্যান্ডের বৃহত্তম ব্যক্তিমালিকানাধীন ওষুধ কোম্পানি স্যানডোজ। স্যানডোজই মাদকাসক্তির উপাদান এলএসডির (Lysergic acid Diethylamide) আবিষ্কারক। নেশা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে স্যানডোজের অবৈধ অর্থের ভাণ্ডার।

কার্টেল প্রথায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ান হফম্যান লা রোসের ফ্যাক্টরিও বাসেল শহরে অবস্থিত। রোস কোম্পানি সৃষ্টি হয় ১৮৯৬ সালে বিভিন্ন ভিটামিন উৎপাদক বড় কোম্পানি হিসেবে। ১৯৫৭ সালে রোস বাজারজাত করে স্নায়ু নিস্তেজক এবং অস্থিরতা ও অনিদ্রা নিবারক ভ্যালিয়াম (মূল নাম ডায়াজিপাম) এবং লিবরিয়াম (মূল নাম ক্লোরোডায়াজিপক্সাইড)।

রোসই পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষতিকর গ্যাস ডাইঅক্সিনের আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠান। রোসের ইতালির সাভেসো শহরের ফ্যাক্টরিতে ১৯৯৬ সালে দুর্ঘটনায় ভোপালের ন্যায় শতসহস্র নগরবাসী শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং বহু নাগরিক মারাও গিয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে রোস পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভিটামিন ও স্নায়ু নিস্তেজক ওষুধের মনোপলি কার্টেল সৃষ্টি করে ব্যাপক হারে আকাশচুম্বী লাভ করেছিল। এ তথ্য ফাঁস করে দেয়ার অপরাধে রোসের ইউরোপীয় ম্যানেজার স্ট্যানলি এডামসের সাত বছর জেল হয় এবং তার স্ত্রী মর্মাহত হয়ে আত্মহত্যা করেন।

ব্রিটিশ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসকে (এনএইচএস) প্রতারণার দায়ে বিলেতের মনোপলি কমিশন রোস কোম্পানিকে ২ মিলিয়ন পাউন্ড জরিমানা করেছিল। বাসেল শহরে ৯০০ প্রকার ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদক কোম্পানি আছে। সিবার পুরো নাম কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাসেল; অর্থাৎ বাসেল শহরের কেমিক্যাল শিল্প সিবা।

সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে লেনিন সাময়িক আস্তানা গাড়লেন সুইজারল্যান্ড কনফেডারেশনের বর্তমান রাজধানী বার্ন শহরের প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছোট মিউনিসিপ্যালিটি গ্রাম জিমারওয়াল্ডে। ছোট দেশ সুইজারল্যান্ড ২৬টি প্রদেশতুল্য কেনটনে বিভক্ত। প্রত্যেক কেনটনের আলাদা রাজধানী আছে, বার্ন কেনটনের রাজধানীও বার্ন। একই সময়ে অন্য রুশ বিপ্লবী লিউওন ট্রটস্কি বাসস্থান গড়েন জিমারওয়ার্ল্ড থেকে ১৬৫ কিলোমিটার দূরে ভিন্ন কেনটন জেনেভা শহরে।

সুইজারল্যান্ডের নিভৃত গ্রাম জিমারওয়াল্ডে অস্থায়ী বসতি গড়ে লেনিন তার অখণ্ড অবসরের সদ্ব্যবহার করলেন অধ্যয়ন ও গবেষণায় এবং অভিনিবেশসহকারে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলেন সুইস শিল্প ও কৃষি উৎপাদন, উৎপাদনকারীদের জীবিকা ও জীবনযাত্রা এবং তাদের স্বাস্থ্য ও কর্মদক্ষতা। কয়েকবার জার্মানিও গেলেন। দেখলেন ও বুঝতে চেষ্টা করলেন বিসমার্কের স্বাস্থ্য উদ্যোগ। লেনিন আরো অনুধাবনের চেষ্টা করলেন, পুঁজিবাদী সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে লব্ধ জ্ঞানের কতটুকু বিপ্লবোত্তর সোভিয়েতের কৃষক শ্রমিকের স্বাস্থ্যনিরাপত্তার কাজে লাগানো যাবে।

লেনিন ঘুরে বেড়ালেন এক কেনটন থেকে অন্য কেনটনে, বার্ন থেকে বাসেল, জুরিখ থেকে জেনেভায়। লক্ষ করলেন প্রদেশসম কেনটনের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, প্রায় সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় গণভোটের মাধ্যমে।

ছোট দেশ সুইজারল্যান্ডের কতক কেনটনের রাজস্ব আসে কৃষিপণ্য ও দুগ্ধজাত দ্রব্য উৎপাদন থেকে, যা বাজারজাত হয় সমবায় পদ্ধতিতে। কতক কেনটনে হস্তশিল্প হিসেবে বিভিন্ন মূল্যের ঘড়ি শিল্পের সমারোহ, কয়েকটি কেনটন একবারে অতি সূক্ষ্ম এবং বড় বড় যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও নির্মাণে ব্যস্ত এবং দেশ-বিদেশে রফতানিতে নিয়োজিত, কতক কেনটনে উন্নত মানের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা ওষুধের মৌলিক গবেষণা ও কাঁচামাল উৎপাদনে নিমগ্ন।

জেনেভা কেনটন জাতিসংঘ অফিস, আদালতের কেন্দ্রস্থল। তবে সব কেনটন বিজ্ঞানশিক্ষা, গবেষণা ও শিল্প বিস্তারে সমভাবে উৎসাহী। শিল্প বা কৃষি, যা-ই হোক না কেন, সব শ্রমিক ও কৃষক স্বাস্থ্যবান, স্বাস্থ্যবতী এবং প্রায় নীরোগ। সব কৃষি শ্রমিক ও অন্য জনগণের জন্য রয়েছে সুলভে স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানশিক্ষার সুবিধা এবং জার্মানির বিসমার্কের চিন্তার বিপরীতে প্রাইভেট স্বাস্থ্য বীমার মাধ্যমে চিকিৎসা সুবিধা ও ওষুধের প্রয়োজনীয় সরবরাহ।

প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানচর্চার ব্যাপক প্রসার ও প্রয়োগ দেখে লেনিন বিস্মিত হলেন। লক্ষ করলেন সুইজারল্যান্ড ও জার্মানির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং সুলভে উন্নত মানের ওষুধপ্রাপ্তি। আশ্চর্যান্বিত হলেন ইউরোপীয় নার্সদের কর্মদক্ষতা ও প্রেরণা দেখে।

চমত্কৃত হলেন সুইস ও ব্রিটিশ নার্সদের ওষুধের ফলাফল সম্পর্কে জ্ঞান, হঠাৎ মূর্ছিত রোগী ও মানসিকভাবে উত্তেজিত রোগীকে শান্ত করা কিংবা নাকের রক্তপাত বন্ধ করার দক্ষতা দেখে। নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্যের প্রয়োজনে লেনিন কয়েকবার সুইস জেনারেল প্র্যাকটিশনার চিকিৎসক (জিপি) ও পলি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন।

তার উপলব্ধি হলো, সবাই নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী হওয়ার উপযুক্ত নয়। পরবর্তী সময়ে লেনিন লিখেছিলেন, ‘রোগীর প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন, ব্যবহারে উষ্ণতা, কাজে নিষ্ঠাবান ও কঠিন অবস্থায় রুগ্ণ, অবসন্ন ব্যক্তিদের যন্ত্রণা লাঘবে নিবেদিত ব্যক্তিরাই নার্স হওয়ার উপযুক্ত। চোখ ঝলসানো পোশাক ও অতিরিক্ত অলংকারে সজ্জিত নার্সদের প্রতি রোগীদের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা থাকে না। দয়া, সততা ও ভালো-মন্দ বিচারের শক্তি নার্সের আচরণের মূলকথা।’

বিপ্লবোত্তর সময়ে লেনিন সমাজ ও সাধারণ মানুষকে উপলব্ধির জন্য নার্স, ডাক্তারি ছাত্র ও স্বাস্থ্যকর্মীদের লিও তলস্তয়, আন্তন চেখভ, ইভান বুনিন, কনস্টানটিন পাউস্তভসকি ও কবি মিখাইল লেরমন্টোভ, ফিওডর তিউেচভ, আলেকজান্ডার ব্লক, সারজেই এসেনিন, ভ্লাদিমির মায়াকভস্কি প্রভৃতি অধ্যয়ন বাধ্যতামূলক করার পরামার্শ দেন।

বিপ্লব-পরবর্তীকালে বয়স্কদের প্রতি সহমর্মিতার জন্য লেনিন লিখলেন, ‘তারা দেশের মঙ্গলের জন্য নিজেদের যৌবন ও শক্তি ব্যয় করেছেন, সংস্কৃতি ও সমৃদ্ধির জন্য তাদের দান অপরিসীম। তাদের প্রতি অমনোযোগ সোভিয়েত স্বাস্থ্য বিভাগের নীতিবোধের পরিপন্থী।’ লেনিনের বিপ্লবের শিক্ষায় উদ্দীপ্ত সোভিয়েত নার্স ও ডাক্তাররা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে অপরিসীম সাহসিকতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

সোভিয়েত সার্জনরা যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্ফোরণের মধ্যেও নার্সদের সঙ্গে নিয়ে অস্ত্রোপচার করে বহু জীবন বাঁচিয়েছেন। নার্স নাটালিয়া পেসকোভা (পেট্রোভা), নিচিপচুরকেভা পানফিলোভা, আন্না তারান-দিসিট্রিয়েস্কোসহ আরো অনেক নার্স নিজেদের জীবনের মায়া অগ্রাহ্য করে বহু বিপ্লবীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন।

রোগীর আকস্মিক প্রয়োজনে তাসখন্দ ৪ নং শিশু পলি ক্লিনিকের মািলউবা ইশান খোদজেভা তার ৪০ বছরের নার্সিং জীবনে অসংখ্যবার রক্তদান করে রুশ জনগণের কৃতজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। রুশ বিপ্লবীদের দিকনির্দেশনার জন্য লেনিন জিমারওয়াল্ডে বসবাসকালে ১৯০২ সালে প্রকাশ করলেন What is to be Done? — ‘কী করিতে হইবে?’

পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের অধীনে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিজ্ঞানের ব্যবহার এবং সুলভ মূল্যে বাজারজাত ও সরবরাহের পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে থাকলেন, ছক আঁকলেন নিজ মনে এবং প্রস্তুতি নিতে থাকলেন অদূর ভবিষ্যতে কৃষক, শ্রমিক ও সৈনিকের সম্মিলিত বিপ্লবের জন্য।

শিল্প বিপ্লবের পরিণতি ও শ্রমিকজীবনে বিপ্লবের প্রভাব মূল্যায়ন এবং বিপ্লবী সংগঠন সৃষ্টির প্রয়াসে পার্টি কংগ্রেসের প্রয়োজনে লেনিন ভ্রমণ করলেন ১৯০৩ সালে ব্রাসেলস হয়ে লন্ডন, ১৯০৫ সালের ডিসেম্বরে ফিনল্যান্ড, যেখানে জোসেফ স্ট্যালিনের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় ঘটে।

এ সময়ে লিখলেন ‘Left wing Communism : An lnfantile Disorder.’ ১৯০৬ সালে পরিভ্রমণ করলেন সুইডেনের স্টকহোম। ১৯০৭ সালের আগস্টে যোগ দিলেন জার্মানির স্টুটগার্টে সমাজতন্ত্রীদের সম্মেলনে, ১৯০৮ সালে প্যারিস, প্রকাশিত হয় ‘Notes of an Ordinary Marxist on Philosophy’. ১৯১২ সালে গেলেন প্রাগ, পরে অস্ট্রিয়ার অধীনস্থ পোল্যান্ডের ক্রাকাওতে। জার্মানি গেছেন বেশ কয়েকবার বিসমার্কের চিন্তার বাস্তবে প্রয়োগ দেখতে। ১৯১৫ সালের ৫-৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় জিমারওয়াল্ড কনফারেন্স। মুক্তির নির্দেশনা ছিল জিমারওয়াল্ড ইশতেহারে।

জিমারওয়াল্ডে বাস করে লেনিন কেবল সুইজারল্যান্ডের কৃষক-শ্রমিকদের চিনলেন-জানলেন তা নয়, মাঠে-ময়দানে বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি ও দুগ্ধ শিল্প বিকাশ, পরিবারভিত্তিক অত্যাধুনিক পরিপূর্ণভাবে নির্ভুল আকর্ষণীয় উচ্চমূল্যের ক্ষুদ্র হাতঘড়ি নির্মাণ ও উৎপাদন এবং বাজারজাতে বিশ্ববাজার দখল প্রক্রিয়া দেখলেন।

চমত্কৃত হলেন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত মানের ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামালের ব্যাপক উৎপাদন, সর্বোপরি উচ্চমূল্যে রফতানির মাধ্যমে এবং মনোপলি কার্টেল পদ্ধতিতে কল্পনাতীত লাভে বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করে।

প্রথম মহাযুদ্ধের মূল সময়টা লেনিন কাটালেন সুইজারল্যান্ডে; বুঝতে চাইলেন প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতশাস্ত্রের পীঠস্থান জুরিখের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সসের////// ব্যবস্থাপনা। লেনিন জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এ টেকনোলজি ইনস্টিটিউট সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন একাধিকবার।

কেবল তা-ই নয়, নিজের বাসস্থান স্থানান্তর করলেন জুরিখে। বিপ্লবোত্তর সোভিয়েতে বিজ্ঞান গবেষণা ও শিক্ষা প্রসারের ভিত্তি ছিল জুরিখ ইনস্টিটিউটের প্রেরণা, বৃহত্তর জনকল্যাণে বিজ্ঞানের ব্যবহার করে পুঁজিবাদের বিপরীতে সমাজতন্ত্রের সুফল অর্জন।

এ ইনস্টিটিউটের ২৫ জন ছাত্র-শিক্ষক ‘নোবেল পুরস্কার’ পেয়েছেন। তাদের অন্যতম হচ্ছেন কনরেড রন্টজেন ও আলবার্ট আইনস্টাইন। এরা জুরিখ ইনস্টিটিউটের ছাত্র ও পরে শিক্ষক হয়েছিলেন।

১৯১৭ সালের ৯ জানুয়ারি একযোগে, একসঙ্গে পেট্রোগ্রাড (সেন্ট পিটার্সবার্গ), মস্কো, বাকু ও আরো কয়েকটি শহরে ধর্মঘট ও শ্রমিক বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯১৭ সালের ১৬ এপ্রিল জুরিখ থেকে ট্রেনে লেনিন সেন্ট পিটার্সবার্গের উদ্দেশে রওনা হন।

৭ অক্টোবর গোপনে সেন্ট পিটার্সবার্গে হাজির হন এবং ১০ অক্টোবর বলশেভিকদের কেন্দ্রীয় কমিটি বৈঠকে বিপ্লবোত্তর সব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকারের প্রথম ডিক্রি ঘোষিত হয়েছিল ১৯১৭ সালের ২৬ অক্টোবর। গঠিত হলো প্রথম সোভিয়েত সরকার। কৃষক হলেন সব জমির মালিক, কাউন্সিল অব পিপলস কমিশনের চেয়ারম্যান হলেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন।

লেনিনের জুরিখের জীবন, বন্ধু ক্রুপস্কয়ার সাহচর্য এবং চিন্তা ও অধ্যয়নে হারিয়ে যাওয়ার বিবরণ আছে লেনিন ইন জুরিখ বইয়ে। সত্তরের দশকের শেষদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আমন্ত্রণে তাদের একটি বই সম্পাদনার কাজে আমি কয়েক সপ্তাহ জেনেভায় ছিলাম।

অবসর সময়ে সলজেনিিসনের লেনিন ইন জুরিখ বইটি পড়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনি-রোববারে আমি সুইজারল্যান্ডে লেনিনকে অবিষ্কারের চেষ্টা করেছিলাম। পুঁজিবাদী পশ্চিমা জগতের একটি বৈশিষ্ট্য— সব প্রকার ইতিহাস সংরক্ষণ। অথচ জিমারওয়াল্ড বা জুরিখ— কোথাও লেনিন ও ক্রপস্কায়ায়//// বাসস্থানের কোনো ফলক পাইনি। জিমারওয়াল্ড মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরিতে গিয়ে জেনেছিলাম স্থানীয় পত্রিকা ইলাসট্রেটেড সোয়াইটজারে ১৯১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রথম পৃষ্ঠায় লেনিনের ছবিসহ একটি খবর প্রকাশ হয়েছিল। সুইজারল্যান্ডে লেনিনের অজ্ঞাতবাসের তথ্য সহজপ্রাপ্য নয়। তথ্যকণ্ঠরোধ পুঁজিবাদের অন্য প্রক্রিয়া।

আমাদের কমিউনিস্ট বন্ধু ও ইতিহাসের ছাত্ররা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারেন। সুইজারল্যান্ডে অবস্থানকালে লেনিন পড়াশোনা করেছেন বিস্তর, লিখেছেন অনেক বই ও নির্দেশিকা, ভ্রমণ করেছেন ইউরোপের দক্ষিণ থেকে উত্তর, পূর্ব থেকে পশ্চিম। ১৯২২ থেকে ১৯২৪-এর মধ্যে লেনিন কয়েকবার পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে বিপ্লবোত্তর সোভিয়েতে চিকিৎসা নিয়েছেন সোভিয়েত চিকিৎসকদের কাছে। তাকে সেবা দিয়েছেন বিপ্লবী সোভিয়েত নার্সরা।

তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডন, জেনেভা বা হাইডেলবার্গ ছুটে যাননি। চিকিৎসা নিজ দেশে নিয়েছেন। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত প্রতিষ্ঠার প্রধান নায়ক লেনিন ১৯২৪ সালের ২১ জানুয়ারি গর্কি শহরতলিতে দেহত্যাগ করেন এবং সমাহিত আছেন মস্কোর রেড স্কয়ার সমাধি ভবনে।

বাংলাদেশের জাতীয় নেতারা কি কখনো জ্ঞানচর্চা করেছেন? লিখেছেন কি কিছু? যা বক্তৃতায় বলেছেন, তা বিশ্বাস করেছেন কি? সামান্য অসুখেও ছুটে গেছেন পশ্চিমের দেশে, নিদেনপক্ষে পূর্বে ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুর। কমিউনিস্ট নেতারা ছুটে গেছেন ভারতে। অসুস্থাবস্থায় বিপ্লবী নগেন সরকার চিকিৎসা নিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে।

মৃত্যুর আগে বিপ্লবী নেতা তোয়াহার কাছে তার একটি আবেদন ছিল, তাকে চীনে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানোর জন্য। নেতাদের কথা ও কাজে মিল নেই বলে দেশ ও জনগণের সার্বিক উন্নয়ন সুদূরপরাহত। খ্যাতনামা সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচি প্রশ্ন করেছিলেন জাতির এক বিখ্যাত নেতাকে— ‘কোন কোন বই পড়ে বেশি আনন্দ পেয়েছেন, কোন বই বা জীবনী পড়ে রাজনীতির পথ স্থির করেছেন?’ উত্তরে নেতা দম্ভভরে বলেছিলেন, ‘আমার বই পড়তে হবে কেন, আমার বই পড়ার সময় কই? আমাকে নিয়ে সবাই বহু বই লিখবে।’ তার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে।

সোভিয়েত বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যচর্চার সঙ্গে পরিচয়
১৯৫৭ সালে আমি ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সে বছর পৃথিবীতে একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছিল।

১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর রাতে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা মহাকাশে পাঠালেন পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘স্পুটনিক’। সারা বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল, দুই ফুটের কম ব্যাসার্ধের ১৮৪ পাউন্ড ওজনের মানুষের তৈরি উপগ্রহটি প্রতি দেড় ঘণ্টায় পৃথিবী পরিভ্রমণ করছে। দ্বিতীয় স্পুটনিক মহাকাশে পৌঁছল ১৯৫৮-এর জানুয়ারিতে। পর পরই মার্কিন বিজ্ঞানীরা তাদের স্যাটেলাইট এক্সপ্লোরার মহাকাশে পাঠাল ৩১ জানুয়ারি, ১৯৫৮-তে।

ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তান তথা পাকিস্তানের কোনো ডাক্তার ছাত্র উচ্চশিক্ষার জন্য সোভিয়েত রাশিয়া যাওয়ার চিন্তা করতেন না। মনে করা হতো, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে রাশিয়া অনুন্নত দেশ। আমাদের দেশের নবীন ডাক্তাররা সুযোগ পেলেই ছুটতেন ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

আমাদের মেডিকেল কলেজের পাবলিক হেলথের কারিকুলামের কোথাও পড়ানো হতো না যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যে শ্রমিক দলের মার্ক্সীয় কিন্তু সংসদীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী ওয়েলসের কয়লা খনির শ্রমিক সন্তান এবং নিজেও কয়লা খনির শ্রমিক এন্যুরিন বিভান স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার পর পরই ১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জাতীয়করণ করে ব্রিটিশ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসেসের (এনএইচএসে) পত্তন হয়েছিল সারা দেশের সব শ্রেণীর জনগণের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে।

বিলেতের এই যুগান্তকারী ব্যবস্থা প্রবর্তনের ৩০ বছর আগে লেনিন সবার জন্য পানি, পয়োব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত করে সবার জন্য স্বাস্থ্যের ভিত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৯১৭ সালে। সর্ব সোভিয়েত নার্সেস ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয় একই সঙ্গে লেনিনের অন্য ডিক্রিতে। পরবর্তী বছর ১৮ হাজার বিপ্লবী নার্স এ সংঘটনের সদস্য হন।

সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় ১৯১৮ সালে জনগণের পাবলিক হেলথ কমিশন গঠনের মাধ্যমে। এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন প্রখ্যাত চিকিৎসক ও সমাজবিজ্ঞানী নিকোলাই সেমাসকো। অধ্যাপক সেমাসকো উচ্চারণ করেছিলেন ‘নার্সদের সিস্টার ডাক। কারণ নার্সরা কেবল স্বাস্থ্যকর্মী নন, তারা একই ঘরের লোক এবং পরমাত্মীয়।’

ডিক্রি বলে যক্ষ্মা, টাইফয়েড, টাইফাসসহ সব সংক্রামক রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা, এবার সব ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর চাকরির জাতীয়করণ করা হয়। অসংক্রামক রোগের ব্যাপক গবেষণা অগ্রাধিকার পায়। সব স্থানে সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ক্রমে ক্রমে স্থাপন হয়।

অনেক জরুরি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানমূলক (Epidemiology) ইনস্টিটিউট এবং মেডিকেল উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয়করণ হলো সব ফার্মেসি ও ওষুধ শিল্প, যুক্ত হলো ওষুধ সৃষ্টির জন্য ব্যাপক গবেষণা; জুরিখ ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টেকনোলজি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আদলে বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থা। রশ্মি ও সূক্ষ্ম ক্যামেরার মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরে চিকিৎসা প্রচেষ্টার জন্য আবিষ্কৃত হলো বিভিন্ন অঙ্গ কর্তন ও সংযোজনের দ্রুত সেলাই যন্ত্র।

একজন রুশ শৈল্যবিদ ১৯৬৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাতের তালুতে রাখা যায় এরূপ একটি ছোট সেলাই যন্ত্র ব্যবহার করে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে একজন রুশ নার্স নিয়ে প্রায় পুরো পাকস্থলী কেটে বাদ দিয়ে অন্ত্রের নিচ থেকে জেজুনাম এনে সংযুক্ত করে ক্যাটগাট ও সিল্ক দিয়ে সেলাই করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র-শিক্ষকদের বিস্ময়াভূত করেছিলেন।

সেদিনের দর্শকদের মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। সোভিয়েত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে এই আমার প্রথম পরিচয়। লেনিন ও বলশেভিকদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রথম পদক্ষেপ ছিল সব শ্রেণীর মানুষকে, স্কুলের ছাত্র, দমকল বাহিনীর কর্মী, পুলিশ, নার্স, ল্যাবরেটরি কর্মী, দাঁত বাঁধাই কর্মী, যানবাহনচালক, সেনাবাহিনীর সদস্য ও গোটা জনসাধারণকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রাথমিক জরুরি চিকিৎসার বিষয়গুলো শিখিয়ে পরীক্ষা নিয়ে সনদ দেয়ার পদ্ধতি প্রচলন।

বলশেভিক বিপ্লবের সময় ১৯১৭ সালে সোভিয়েতের মোট চিকিত্কদের প্রায় ৪০ শতাংশ মস্কো শহরে বসবাস করে প্র্যাকটিস করতেন। অধিকাংশ পল্লী ও উপশহরে গুটি কতক চিকিৎসক ছিলেন। এসব এলাকায় কদাচিৎ চিকিৎসক দেখা যেত।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের চিত্র ঠিক এরূপ ছিল!
লেনিন নতুন ডিক্রিবলে গ্রামের অধিকসংখ্যক ছেলেমেয়েকে বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নের সুযোগ করে দিলেন। স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় উচ্চগ্রেডপ্রাপ্তির চেয়ে জনগণের সেবায় যাদের আকর্ষণ আছে, তারা বিনা টিউশন ফিতে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নের সুযোগ পেল।

অধিকাংশ ছিল পল্লী ও নিভৃত জনপদের কৃষক-শ্রমিকের সন্তান। মেডিকেল প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ভর্তির সংখ্যা বেড়ে গিয়ে ৬০ হাজার অতিক্রম করল। জোসেফ স্ট্যালিনের সময়ে এ সংখ্যা ৭৬ হাজারে উন্নীত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ৪৫ বছর পরও বাংলাদেশে মেডিকেল কলেজে ভর্তির সংখ্যা ১০ হাজার অতিক্রম করেনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর কৃষক-শ্রমিকের বিপ্লব এক কথা নয়।

চিকিৎসার মান কোনো অংশেই ইউরোপের পশ্চাতে নয়। যক্ষ্মা আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামালয় স্থাপিত হলো সব শহরে। ১৯২৫ সালের মধ্যে ইয়াল্টাতে কৃষক ও তার পরিবারের বিনোদনকেন্দ্র স্থাপিত হলো। কেবল মেধা নয়, সেবার মনোবৃত্তির প্রমাণ রাখতে হতো ধাপে ধাপে গ্রাম থেকে উপশহরে, উপশহর থেকে শহরে সব শ্রেণীর অসুস্থ ব্যক্তিদের সেবা ও চিকিৎসা দিয়ে। সেবা চিকিৎসকের উন্নতির মান নিয়ামক।

চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জনগণের প্রতি কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সংবিধানে একটি আইন আছে। সেই আইনে বলা আছে, ‘পেশাদারি কর্তব্য পালনে অবহেলা এমনিতেই দণ্ডনীয় অপরাধ, যদি না সেটা ফৌজদারি আইনে সোপর্দনীয় হয়।’

পলি ক্লিনিকের ডাক্তাররা (পশ্চিমা জগতের ‘জিপি’ সমতুল্য) প্রয়োজনে বাসায় গিয়ে রোগীর চিকিৎসা দেন, আকস্মিক বিপজ্জনক অসুখে বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তাত্ক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রোগী বা আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি বা রেফারেলের প্রয়োজন আছে কিনা সিদ্ধান্ত দেন।

‘সর্বত্যাগী পরিশ্রম ও রোগীদের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসার জন্যই সোভিয়েত চিকিৎসাকর্মীরা সর্বজনের শ্রদ্ধার পাত্র এবং কমিউনিস্ট পার্টি ও সোভিয়েত সরকারের যত্ন-পরিবেষ্টিত। উল্লেখ্য, সোভিয়েত ইউনিয়নে মেডিকেলে সব চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যশিক্ষা দান হয় বিনা খরচে এবং নিয়মিত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির সবার সমান সুযোগ রয়েছে।

পল্লী বা অবহেলিত জনপদের চিকিৎসক তার প্রাপ্য সম্মান ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন না, বরং অগ্রাধিকার পান।’ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে পার্থক্য এখানে।

১৯৬৯ সাল! হফম্যান লা বোসের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ মনোপলি কমিশনের শাস্তি বিধানের সম্ভবত পরের বছর। বিলেতের দ্য অবজার্ভার পত্রিকার সামনের পৃষ্ঠায় এক খবরে ইংলিশ স্কটিশ চিকিৎসক এবং কমনওয়েলথ দেশগুলো থেকে উচ্চশিক্ষার কামনায় আসা চিকিৎসকরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে জানলেন যে, তারা যে ব্রিটিশ ও আমেরিকান ওষুধের উন্নত মানের গর্ববোধ করেন, তা ব্রিটেন বা আমেরিকায় উৎপাদিত নয়।

প্রায় সব কাঁচামাল উৎপাদন হয়েছে পূর্ব ইউরোপের সোভিয়েত ব্লকের ছোট সমাজতন্ত্রী দেশগুলোয়। ব্রিটেনের গর্ব ইম্পেরিয়াল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (আইসিআই) টেরামাইসিন (মূল নাম টেট্রাসাইক্লিন) বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি ফাইজারের পেনিসিলিন ও অন্যান্য অ্যান্টিবায়োটিক ট্রান্সফার প্রাইসিং পদ্ধতিতে সমুদ্র মাঝপথে উৎপাদক দেশের নাম বদলে ‘ইউএসএ’ তকমা লাগিয়ে ব্রিটেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রেসক্রিপশন বাণিজ্য করছে এবং চিকিৎসকদের বোকা বানাচ্ছে। ট্রান্সফার প্রাইসিং পুঁজিবাদের অন্যতম প্রতারণা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ওষুধ কোম্পানি ফাইজার এজিথ্রোমাইসিনের আবিষ্কারক নয়। ফাইজার মাত্র ১ লাখ ডলার দিয়ে স্ল্লোভাকিয়ার রাষ্ট্রীয় ওষুধ গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের আবিষ্কৃত এজিথ্রোমাইসিনের বিশ্বের সব দেশে বাজারজাতের স্বত্ব কিনে প্রথম বছরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যে বাজারজাত করে ১ বিলিয়ন ডলারের অধিক লাভ করেছিল। পরবর্তী বছরগুলোয় একই লাভের হার বহাল ছিল।

বলিহারি পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থা! ওষুধ শিল্পের প্রকৃত সূতিকাগার ব্রিটেন বা আমেরিকা নয়, মূল ওষুধ অর্থাৎ ওষুধের কাঁচামাল উত্পন্ন হয় সমাজতন্ত্রী দেশগুলোয়। এ সত্য মেনে নিতে ব্রিটেনের চিকিৎসকদের ভয়ানক মানসিক যাতনা হয়েছিল।

মুুক্তিযুদ্ধের ফিল্ড হাসপাতাল
ব্রিটেনে সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমি ও ডাক্তার এমএ মবিন ১৯৭১ সালের মে মাসে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা পৌঁছলাম। জেনারেল ও ভাসকুলার সার্জারি আমার জীবিকা। মবিনের রয়েছে অর্থোপেডিক ও কার্ডিয়াক সার্জারির অভিজ্ঞতা। আমি পাস করেছি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে, মবিন ঢাকার ছেলে কিন্তু পাস করেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে।

আগরতলায় সাক্ষাৎ পেলাম মেজর জিয়ার, যিনি শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার মুখে শুনলাম সে দিনগুলোর কথা। দেখা পেলাম মেজর শফিউল্লাহ, মীর শওকত আলী, নুরুল ইসলাম শিশুর এবং আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ক্যাপ্টেন শওকত আলীর।

মেজর খালেদ মোশাররফ আমাদের নিয়ে গেলেন রণক্ষেত্রে। দেখালেন কী করে ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, ইমামুজ্জমানরা ফেনীর বিলোনিয়া দখলে রেখে বাংলাদেশের পতাকা উড্ডীয়মান রেখেছেন। কমান্ডো মেজর এটিএম হায়দার কিশোর তরুণদের গেরিলা যুদ্ধের ট্যাকটিকস প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

ক্যাপ্টেন মাহবুব, গাফফার, লেফটেন্যান্ট হারুন, হুমায়ুন কবির, জয়নুল অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো। বিভিন্ন সাবসেক্টরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য একটি ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের প্রস্তাবে খালেদ মোশাররফ বললেন, ‘১০ জন আহত হলে আমি তখনই ১০০ গেরিলা পাঠাতে পারি, আরো ৫০০ জন রেডি আছে।

আমার ডাক্তার দরকার নেই, আমার প্রয়োজন গানস অ্যান্ড বুলেটস। আপনারা বিলেতে ফিরে যান, অর্থ সংগ্রহ করুন, আইআরএর সঙ্গে যোগাযোগ করুন, চেকোস্লোভাকিয়ায় যান অস্ত্র জোগাড় করে পাঠান। ভারত আমাদের চাইনিজ অস্ত্রের বদলে তাদের অস্ত্র দিচ্ছে সীমিতসংখ্যক।’

কয়েক দিনের মধ্যে গেরিলা যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ল, আহতের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলল। তখন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানী ও প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পূর্ব সীমান্তে মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র ফিল্ড হাসপাতাল তৈরির নির্দেশ দিলেন, কিছু অর্থ সাহায্য করলেন। মূল টাকার জোগান দিলেন ব্রিটেনস্থ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা। তবে বিলেতের রেস্টুরেন্টের সিলেটি সাধারণ কর্মচারীরা তাদের আয়ের তুলনায় চিকিৎসকদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি অর্থ নিয়মিত দান করেছেন।

বুড়ি বাড়িওয়ালীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এক রুমে তিন শিফটে পালা করে ১০ জন বাস করে অর্থ সঞ্চয় করে মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে দিয়েছেন। সীমান্তসংলগ্ন মেলাঘরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের দেহরক্ষী হাবুল ব্যানার্জির আনারস বাগানে স্থাপিত হলো ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। পুরোপুরি বাংলাদেশী ডাক্তার ও স্বাস্থ্য সেবিকা পরিচালিত।

খোঁজ নিয়ে দেখলাম, পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় পাঁচ হাজার চিকিৎসক থাকলেও ভারতে এসেছেন দেড় ডজন চিকিৎসক, অধিকাংশই তরুণ। একজন সিনিয়র শল্য চিকিৎসক, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক এমএন দত্ত এফআরসিএস ভারতে এসে কলকাতায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস জাঁকিয়ে বসেছেন।

আরেক এফআরসিএস ডা. টি. হোসেন প্রবাসী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব নিয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তানের নার্সদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হিন্দু ও খ্রিস্টান। খ্রিস্টান নার্সরা দেশত্যাগ করেননি। হিন্দু নার্স যারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছেন, তারা প্রাণভয়ে ভীত, সীমান্তের ফিল্ড হাসপাতালে কাজ নিয়ে পুনরায় বিপদের সম্মুখীন হতে রাজি নন।

কেবল সার্জন দিয়ে হাসপাতাল চলে না, বিশেষত রণাঙ্গনের হাসপাতাল। প্রস্তাব দিলাম বিলেত থেকে নার্স আনার জন্য। ওসমানী সাহেব সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি দিলেন। বললেন, ‘ব্রিটিশ নার্সেস আর দ্য বেস্ট।’ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে তিনি বার্মার রণাঙ্গনে আহত হয়েছিলেন।

সেবা দিয়ে তাকে ব্রিটিশ নার্স সুস্থ করে তুলেছিলেন। সে কথা তিনি ভোলেননি। কিন্তু বাদ সাধলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন। তিনি বললেন, রণাঙ্গনের হাসপাতালে বিদেশী নার্স নিয়োগ ঠিক হবে না। কারণ সমরে ও প্রেমে সবকিছু নিয়ম মেনে চলে না, বরং সত্যই জয়ের প্রধান বাধা।

বিকল্প পথের সন্ধান নিতে হলো। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী অনেক ছাত্র ইউনিয়ন নারী কর্মীকে নিয়ে আগরতলার আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটস হোস্টেলে অবস্থান করছিলেন। সাক্ষাৎ করে বললাম, ‘আপনি রণক্ষেত্রে নার্সেস বিগ্রেড তৈরির দায়িত্ব নিন।’ উত্তরে বললেন, ‘তাদের ভিন্ন পরিকল্পনা আছে, তারা নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন।’ উপলব্ধির চেষ্টা করলাম ‘Left wing Communism : An Infantile disorder’-এর মর্মার্থ।

হতাশার মাঝে মনে পড়ল লেনিনের অমোঘ বাণী— ‘কী করিতে হইবে?’ ‘বিপ্লব সাজানো বাগান নয়, কর্ষণ করে ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হয়। প্রশিক্ষণে কৃষক শ্রমিক পরিণত হয় বিপ্লবের সৈনিকে, তরুণী হয় সিস্টার, পরমাত্মীয় নার্স।’ দীর্ঘ তিন বছর হাসপাতাল চত্বরে সাদা পোশাকে ভূষিত হয়ে প্রশিক্ষণের চেয়ে ‘উষ্ণ ব্যবহার ও কঠিন অবস্থায় রুগ্ণ, আহত ব্যক্তির যন্ত্রণা লাঘবে নিবেদিত ব্যক্তিই নার্স হওয়ার উপযুক্ত।’ চোখ ঘোরাতেই নজরে এল শত শত নার্স হওয়ার মনমানসিকতার তরুণী।

খুঁজে বের করা হলো আধা ডজন ফাইনাল ইয়ারের এমবিবিএস ছাত্র, শখানেক কিশোরী তরুণী ১০ম শ্রেণী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে। নির্বাচন করে প্রশিক্ষণ দেয়া হলো দু-চার সপ্তাহের। শেখানো হলো ‘সেবা, সহমর্মিতা ও দয়াশীল আচরণ।’ পরিচিত হলো কতক সাধারণ মেডিকেল যন্ত্রপাতির সঙ্গে, অতি সর্তকতার সঙ্গে শিখল যন্ত্রপাতি নির্বীজকরণ পদ্ধতি ও ওষুধসহকারে ড্রেসিং করা এবং আরো জানল, খান তিরিশেক অতিপ্রয়োজনীয় সহজপ্রাপ্য ওষুধের গুণাবলি, ব্যবহার ও ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে সদ্য পাস টঙ্গীর ডা. নাজিম উদ্দিন আহমদ আগরতলার জিবি হাসপাতালে চার সপ্তাহের প্রশিক্ষণ নিয়ে ৪৮০ বেডের বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের প্রধান অবেদনকারীর (অ্যানেস্থেশিস্ট) দায়িত্ব নিলেন। শত শত আহত মুক্তিযোদ্ধা সেবা পেয়েছেন এ হাসপাতালে। অনেকের বুকের পাঁজর থেকে গুলি বের করে আমরা জীবন বাঁচিয়েছি।

আহত মেজর খালেদ মোশাররফের প্রাথমিক চিকিৎসা বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালেই হয়েছিল। পরে তাকে লক্ষে সেন্ট্রাল কমান্ড হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সার্জনরা কুমিল্লার তরুণ মুক্তিযোদ্ধা বাহারের পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। ডা. মবিনের চিকিৎসা এবং গীতা, ইরা, পদ্মা, আসমা, রেশমার যত্নে বাহারের টুকরো হয়ে যাওয়া নিম্নাঙ্গ এখনো অক্ষুণ্ন আছে। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাহার একবার কুমিল্লা মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী: ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Add

© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com