রবিবার, ৩১ মে ২০২০, ০৭:৪৬ পূর্বাহ্ন

সততা যার রাজনীতির পুঁজি

সততা যার রাজনীতির পুঁজি

নিজস্ব প্রতিবেদক: 

কাজী শফিক মোস্তফা (চঞ্চল) সাবেক ছাত্রলীগ ও বর্তমানে খিলগাঁও থানা আওয়ামী লীগের পরিচ্ছন্ন এক নেতা। বাবা কাজী আব্দুল হাফিজ (পিডিবির সাবেক কর্মকর্তা)।

স্ত্রী সানজিদা মোস্তফা। মেয়ে তাবাসসুম মোস্তফা লাবিবা খিলগাঁও সাউথ পয়েন্টে ক্লাস ফোরের ছাত্রী। কাকা প্রয়াত পলাশ আনোয়ার মতি অবিভক্ত ঢাকার সাবেক কমিশনার এবং মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ছিলেন। একমাত্র সহোদর কাজী শামীম মোস্তফা (উজ্জ্বল) এখন জাপান প্রবাসী। ভাবী শামসুন্নাহার লাভলী জাপান মহিলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক। গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলায় হলেও ঢাকার খিলগাঁওয়ের সি ব্লকে তাদের পরিবার বসবাস করছে প্রায় ৬০ বছর ধরে।

ছাত্রলীগের রাজনীতি করার সময় চঞ্চল সান্নিধ্য পেয়েছেন নজরুল ইসলাম বাবু, লিয়াকত সিকদার, বাহাদুর বেপারী, মামুনুর রশীদ শুভ্রর মতো ছাত্রনেতাদের। সম্প্রতি জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতি প্রসঙ্গে কথা হয় সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে-

রাজনীতির হাতেখড়ি কার কাছে?
১৯৯১ সাল থেকে আমার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া। সে সময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সঙ্গে সবেমাত্র যুক্ত হয়েছি। পারিবারিকভাবে বাবা, বড় ভাই ও কাকা পলাশ আনোয়ার মতিকে (সাবেক ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার) দেখে রাজনীতি করায় উৎসাহিত হই। প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে নৌকার পক্ষে কাজ করি। তখন আমাদের এই এলাকাটি ছিল ঢাকা-৬ আসন (বর্তমানে ৯)। নৌকার প্রার্থী ছিলেন মোজাফফর হোসেন পল্টু ভাই।

ছাত্র রাজনীতিতে পুরোদমে কবে থেকে যুক্ত হয়েছিলেন?
১৯৯৩ সালে এসএসসি পাসের পর খিলগাঁও মডেল কলেজে ভর্তি হই। ১৯৯৫ সাল, বিএনপি তখন ক্ষমতায়। ছাত্র সংসদের নির্বাচন করে আমি ও আমার বন্ধু তানজীর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে জয়ী হই। বাকিদের সবাই ছিল ছাত্র সমাজ ও ছাত্রদলের।

১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির প্রহসনের নির্বাচনের প্রতিবাদে ২৩ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ঢাকার তৎকালিন মেয়র হানিফের উদ্যোগে জনতার মঞ্চ তৈরি করা হয়। ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে আমরা প্রতিদিন কলেজের সামনে থেকে ট্রাকে করে সভাস্থলে যেতাম। ওই সময় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ডাকা হরতাল কর্মসূচি সফল করতে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে রাজপথে মিছিল, পিকেটিং করেছি।

১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয় আমাকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে ঘুরে ঘুরে কর্মি সংগ্রহ করি। স্থানীয় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাই। ইউনিট পর্যায়ে ছাত্রলীগ গঠন করি। খিলগাঁও থানা ছাত্রলীগ গঠনের সময় ৫ সদস্যের নির্বাচক মন্ডলীর সদস্য ছিলাম। আজ গর্ব করে বলতে পারি খিলগাঁওয়ে ছাত্রলীগ সুসংগঠিত একটি ছাত্র সংগঠন। এক্ষেত্রে আমার কাকা পলাশ আনোয়ার মতি ও বর্তমান ঢাকা দক্ষিণের ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ওয়াহিদুল হাসান মিল্টন ভাইয়ের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করছি।

১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সাবের ভাই (সাবের হোসেন চৌধুরী) ঢাকা-৬ থেকে নির্বাচন করেন। ওই নির্বাচনে আমরা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতা কাজ করি। তার নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালিত হতো কাকরাইলের এইচআর ভবন থেকে। আমরা প্রায় প্রতিদিন সেখানে যেতাম। অনেক রাত পর্যন্ত নির্বাচনী কাজ করতাম।

আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর পরবর্তী কর্মকান্ড কি ছিল?
২০০২ সালে ওয়ার্ড ছাত্রলীগের পদ ছেড়ে মহানগরের সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ শুরু করি। তখন ছাত্রলীগ দক্ষিণের সভাপতি ছিলেন মামুনুর রশীদ শুভ্র ভাই (বর্তমানে ঢাকা মহানগর আওয়ামীলীগ দক্ষিণের সহ-প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক), সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কবির ভাই। একই বছর খিলগাঁও থানা আওয়ামী লীগের যে কমিটি গঠিত হয় তাতে আমি সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি।
ওই সময় বিএনপি ক্ষমতাসীন। দল থেকে হরতাল আহ্বান করা হলে ধরপাকড়ের আশঙ্কায় রাতে বাসায় থাকতে পারতাম না। একবার কি ভেবে যেন বাসায় ছিলাম। রাত দেড়টার দিকে পুলিশ বাসায় হানা দেয়। কোনো মতে বাড়ির দেয়াল টপকে পাশের বাসায় আশ্রয় নেই। ভোর চারটা পর্যন্ত পুলিশ আমার ও কাকার খোঁজে বাসায় তল্লাশী চালায়।

অন্যান্য সাংগঠনিক কর্মকান্ড…
স্থানীয় মসজিদুল আমান জামে মসজিদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এখন দায়িত্ব পালন করছি। এলাকার মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খিলগাঁও উত্তর-পশ্চিম সোসাইটি নামে একটি সামাজিক সংগঠন গড়ে তুলি আমরা কয়েকজন মিলে। এলাকার লোকজনের অনুরোধে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সেখানে দায়িত্ব পালন করছি।
চলমান শুদ্ধি অভিযানকে কিভাবে দেখেন?

নেত্রী দলে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন তাকে আমি স্বাগত জানাই। আমাদের হাত পরিষ্কার। কোনো রকম দুর্নীতির সঙ্গে আমরা নেই। কষ্ট হয় যখন দলে অনুপ্রবেশকারিদের দেখি। যারা এক সময় আমাদের মিছিলে ধাওয়া করেছে, গুলি করেছে তাদের যখন দেখি বুক চেতিয়ে সামনে দিয়ে হেঁটে চলে তখন খারাপ লাগে।

রাজনীতি নিয়ে কোনো স্মরণীয় ঘটনা?

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সাবের ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যাই। সভার মঞ্চ থেকে একটু দূরে ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ, ধোঁয়া। চারদিকে সবাই ছুটোছুটি করছে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম রক্তাক্ত মানুষ রাস্তায় শুয়ে ছটফট করছে। সাবের ভাইয়ের সঙ্গে মিলে আমরা আহতদের হাসপাতালের পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম। ওই ঘটনায় আমাদের অনেক পরিচিতজন সেদিন নিহত-আহত হয়েছিলেন।

পরে ২১ আগস্টে ওই ঘটনার প্রতিবাদে ডাকা হরতাল কর্মসূচি পালনের সময় মালিবাগ থেকে আমি গ্রেপ্তার হই। ভাংচুর মামলার দুই নম্বর আসামী হিসেবে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাবের ভাই আমাকে আইনী সহায়তা দেন। কিছুদিন কারাভোগের পর বেরিয়ে আসি। এর পর আরো উদ্যমী হয়ে মিছিল-মিটিংয়ে যাই।

২০০১ সালের ক্ষমতা ছাড়ার আগে নেত্রী তেজগাঁওয়ে শেষ বক্তৃতা করেন। আমরা যখন ওই সমাবেশ শেষ করে এলাকায় ফিরছিলাম তখন আমাদের ওপর গুলি বর্ষণ করা হয়। ভাগ্যগুনে আমরা বেঁচে যাই।

একবার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে রমনা হোটেলে তৃতীয় তলায় উঠে পড়ি। আমাদের সঙ্গে সেখানে আহসান উল্লাহ মাস্টারও উঠেছিলেন। তার সঙ্গে কথা বলে খানিকটা সময় কাটাই। বেশ অমায়িক ব্যবহার দেখেছি তার। আদর্শ মাস্টারই মনে হয়েছিল তাকে। ওই ঘটনার কিছুদিন পর গাজীপুরে ব্রাশফায়ারে তিনি মারা যান।

আপনার কাকা পলাশ আনোয়ার মতি তো যুবলীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতা ছিলেন…
হ্যাঁ, আমার কাকা পলাশ আনোয়ার মতি অবিভক্ত ঢাকা মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সোভিয়েত ইউনিয়নে পাঠান। সেই দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন আমার কাকা। তারা সেখানে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরবর্তী সময়ে আমার কাকা রাজনীতি বিষয়ের ওপর সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়ালেখা করেন।

তিনি ঢাকার সাবেক ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার ছিলেন। মৃত্যুর আগে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ছিলেন।

পারিবারিকভাবে শোনা মুক্তিযুদ্ধকালিন কোনো স্মৃতি, যা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে…
আমার বাবা তখন পিডিবি (পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড) এ কর্মরত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ যেন ঠিকভাবে প্রচার হতে না পারে সেজন্য পাকিস্তান সরকার রেসকোর্স ময়দানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আমার বাবাসহ আরো বেশ কয়েকজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে সেদিন বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রাখেন। বাবা দাঁড়িয়ে থেকে সেই কাজের তদারকি করেন।
রাজনীতিতে চাওয়া-পাওয়ার হিসেব কি মিলেছে?

রাজনীতি আমার নেশা, পেশা নয়। আমার বাবা বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি। শেখ হাসিনাকে ভালোবাসি। তার কথা- বঙ্গবন্ধুর মেয়ে বঙ্গবন্ধুর মতোই হয়েছে। কাকাকে দেখে রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা পেয়েছি আমি। মানুষের বিপদে কাকাকে দেখেছি দিন নেই, রাত নেই ছুটে বেড়িয়েছেন। দলের বাইরে আমি কখনো কোনো কাজ করিনি। ভবিষ্যতেও করবো না।

ব্যক্তি জীবনে কারো সঙ্গে আমার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, কখনো কোনো রকম দুর্নীতি করিনি। আমার পরিবার আমাকে সেই শিক্ষা দেয়নি। সাধ্যের মধ্যে মানুষের উপকার করার চেষ্টা করি। কাজ করার বিনিময়ে কারো কাছ থেকে একটি টাকা নিয়েছি, কেউ বলতে পারবে না।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Add

© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com