বুধবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৬:৩৫ পূর্বাহ্ন

বিশেষ বিজ্ঞপ্তি :

নিউজ পোর্টাল ও আইপি টেলিভিশন  আজকাল২৪.কম-এ ঢাকা সিটির প্রতি থানা ও সারেদেশে "রিপোর্টার/সংবাদদাতা" নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা জীবন বৃত্তান্ত ইমেইল করুন aajkaalbd@gmail.com

ধারাবাহিক উপন্যাস “নিশি” (৩য় ও ৪র্থ কিস্তি)

ধারাবাহিক উপন্যাস “নিশি” (৩য় ও ৪র্থ কিস্তি)

ইব্রাহীম খলিল জুয়েল

তিন.
নিশি ভাবতে লাগলো কোনো বান্ধবীর বাসায় গিয়ে উঠবে কি? তুষ্টিদের বাসায় গিয়ে উঠলে কেমন হয়? তুষ্টির মা খুব ভালো মানুষ। নিশি এ পর্যন্ত যতোবার গিয়েছে বেচারি নিজের মেয়ের মতো আদর যত্ন করেছেন, প্রাণখোলা উচ্ছ্বাস দেখিয়েছেন। কিন্তু সেটা তো অল্প সময়ের জন্য বলে। প্রায় একমাস সময় কাউকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না। তা ছাড়া ঢাকা শহরে এটি প্রায় অসম্ভবই। তার চেয়ে ভালো পিয়ারপুরে চলে যাওয়াটাই।

সেখান থেকে চিঠিতে তুষ্টিকে সব জানানো যাবে। পিয়ারপুর নিজের গ্রাম। অনেক দিন গ্রামে যাওয়া হয় না। গ্রামে গেলে বাবা-মা’র সঙ্গেও কিছু দিন থেকে আসা যাবে। বইপত্র কিছু নিয়ে নিলে ভালো হতো। কিন্তু যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে সেখানে আবার যাওয়াটা ঠিক হবে না। ভাইয়া হয়তো বিকেলে এসে বান্ধবীদের বাড়িতে খোঁজ নেবে, তারপর কলেজে। অবশেষে রাতে ভাবীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি, পরদিন বিকেলে পিয়ারপুরে উপস্থিত।

পিয়ারপুর গেলে সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। আড়াইটার ট্রেন ধরতে হবে। এখনো সে শাহবাগেই আছে। রিকশা নিয়ে কমলাপুর স্টেশনে চলে গেলে মন্দ হয় না। ওয়েটিং রুমে বসে ঘণ্টা খানেক ম্যাগাজিন পড়লে সময় চলে যাবে। সে রিকশা নিয়ে সোজা কমলাপুর গেলো।

বিকেল হয়ে এলো। ট্রেনের জানালা দিয়ে সবুজ মাঠ, ধানের জমি, দূরে গ্রামে ছোট ছোট ঘর দেখতে খুবই ভালো লাগছিল। একটি অদৃশ্য হয়, আরেকটি আসে। সব কিছু যেন ঘুরছে। ট্রেনটি এতোক্ষণ একটি বনের মধ্যে দিয়ে আসছিল। দু’ধারে বন। ঘন গাছপালা আর পাতা লতায় আবৃত এই বন।

কেমন অন্ধকার দেখাচ্ছিল। এই নিঝুম, নিস্তব্ধ বনে একটি রাত থেকে গেলে কেমন হয়! একাকী বনের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে সারা রাত ঘুরে বেড়ালে আর গুনগুন করে গান গাইলে! হেঁটে গেলে শুকনো পাতা পায়ের নিচে পড়ে গুঁড়িয়ে যাওয়ার মচ্মচ শব্দ। রাতটি যদি চাঁদনী রাত হয়! কী উপভোগ্যই না পরিবেশটা! নিশি কল্পনার সব দরজা খুলে দিয়ে অনুভব করতে লাগলো। ট্রেন ছুটে চলেছে ঝক-ঝকাঝক- ঝক-ঝকাঝক। মনে মনে যা বলছে ট্রেনটাও যেন তাই বলে চলেছে।

দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার বদ্ধপরিবেশে থেকে নিশি অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছে। কৃত্রিমতা প্রাণখোলা হাসিটি কেড়ে নিয়েছে। আগে মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়ি যেতো। বছর তিনেক ধরে মোটেই যায় না। তাই গ্রাম এবং গ্রামের নিবিড়, নিস্তব্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশকে আজ সে নতুন করে আবিষ্কার করার জন্য নতুন দৃষ্টি নিয়ে দেখছে; অনুভূতির দ্বারকে করেছে উন্মুক্ত। সকালের ঘটনাটি তার ভীষণ মনে পড়ছে। শোভন তার দু’বছরে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে এতোটুকু মূল্যও দেয়নি। তার ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কেঁদে ফেললেই নিজেকে অনেকটা হালকা লাগবে। কিন্তু ট্রেনে বসে এটি সম্ভব হচ্ছে না।

জানালা দিয়ে শোঁ-শোঁ করে বাতাস আসছে। পুরোটাই তার শরীরে লাগছে। ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। তাই নিশি একটি জানালা বন্ধ করে দিলো। অন্যটি দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে। রাত আটটায় সে পিয়ারপুর স্টেশনে নামবে…।

চার:
‘নে হাত মুখ ধুয়ে শুয়ে থাক। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নে। দেখি কি তরকারি রাঁধা যায়। পেঁপে দিয়ে শিং মাছের ঝোল আর পাতলা ডাল চলবে তো?’ শোভনকে উদ্দেশ্য করে সাজিদ বললো। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে শোভন বললো, ‘বলিস কি। এ খাবার খেলে তো কয়েক দিনেই শরীরে রক্ত বেড়ে যাবে। ভালোই হবে সন্ধানীতে দু’ব্যাগ রক্ত দেয়া যাবে। কিন্তু ঘণ্টা দু’য়েক আমি কিছু খাচ্ছি না।’

‘খাবি কিভাবে। খাওয়ার আগে সিগারেট ধরিয়েছিস। খিদে কি আর থাকে?’
‘তুই কী বুঝবি। সিগারেট আর গাঁজার ধোঁয়া ছাড়া কি বাঁচার সাধ জাগে? এ দু’টি ছাড়া আমি জীবনকে এক দিনের জন্যও ভাবতে পারি না। মনে কর, আমি নিশির সঙ্গে কথা বলছি, আড্ডা দিচ্ছি, কোথাও ঘুরতে যাচ্ছি। এমন কিছু ভাবতেই দেখি আমার দু’আঙ্গুলের ফাঁকে একটি সিগারেট ধোঁয়া ছাড়ছে।’

হঠাৎ নিশির কথা উঠায় সকালের ঘটনাটি তার মনে পড়ে গেলো। শোভনকে একটু বিচলিত দেখালো। নিজেকে সামলে নিতে বেশিক্ষণ লাগলো না। তাৎক্ষণিক সে বললো, ‘ধর আমার পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে, ভালো কিছু করেছি। আনন্দের এ খবর শোনার আগে আমি চাই একটি জ্বলন্ত সিগারেট।

আমার খুব খারাপ লাগছে, আমি একটু ঘুমাবো। রান্না হলে তুই খেয়ে নিস। ঘুম থেকে উঠে আমি খাবো।’বলে শোভন ঘুমিয়ে পড়লো। সাজিদ খাওয়া সেরে শোভনের খাবার রেডি করে রাখলো এবং একটি চেয়ার টেনে বারান্দায় বসলো।

তিনতলার একটি রুমে সাজিদ থাকে। সামনে একটি ছোট্ট বারান্দা। গরমের দিনে রাতের বেলায় ঝির ঝিরে বাতাসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগে।

সন্ধ্যা হয়ে এলো। সাজিদ পত্রিকায় চোখ বোলাচ্ছে আর নিচে মাঠে ছোট ছেলেদের বল খেলা দেখছে। সন্ধ্যার পর শোভন ঘুম থেকে উঠলো। হাই তুলে হাত দুটোকে উপরে টান করে দিলো। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এলো। সাজিদ শোভনের খাবার দেখিয়ে দিল। শোভন অর্ধেক খেয়ে উঠে এলো এবং একটি সিগারেট ধরালো।

‘খুব ভালোই রেঁধেছিস। এমন খাবার জীবনে আর খাইনি।’শোভন উদাসভাবে বললো।

সাজিদ বললো, ‘কিরে নেশা কেটেছে? এখন বাসায় যা। খালাম্মা আবার চিন্তা করবেন।’

‘চিন্তার কোনো কারণ নেই। তোর খালাম্মা এখানে থাকেন না। তিনি থাকেন বাগেরহাটে। আর পাইক-পেয়াদা, কুটুম-কুটুম্বী যারা আছে তারা কিছু বলবে না। আমি প্রায়ই রাত দশটা-এগারোটায় ফিরি। তাই এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। গাঁজা শেষ হয়ে গেছে। ভানু বাবুর দোকানে আবার যেতে হবে।’

‘গাঁজা খাওয়াটা ছাড়তে পারিস না? সিগারেট খাচ্ছিস এটাই খা।’

‘গাঁজার ফিলিংসটাই তো তুই পাস নি। আমার প্রথম দিনের ফিলিংসটা তোকে বলি…’।

শোভন তার প্রথম দিনের গাঁজা খাওয়ার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে লাগলো… ‘আমি তখনো সিগারেটের উপরে যাইনি। একদিন হলে দুলালের রুমে গেলাম। দুলাল বললো, আমি একখানে যাবো তুই কি যাবি আমার সঙ্গে? আমি বললাম, কোথায়?’

দুলাল বললো, গাঁজা টানতে পার্কে। আমি একটু কৌতূহল অনুভব করলাম। ভাবলাম জীবনে সব ধরনের এক্সপেরিয়েন্স থাকা দরকার। দুলাল গাঁজার পুটলা আর কমদামি চারটি সিগারেট নিয়ে সোজা চলে গেলো উদ্যানে। সঙ্গে আমিও গেলাম। রাত তখন নয়টা। দুলাল সিগারেটগুলো থেকে তামাক বের করে কৌশলমতো তাতে গাঁজা ভরে একটি আমাকে দিলো আরেকটি সে ধরিয়ে টানতে লাগলো।

সে খুব নরমাল ভাবেই টানছে। সিগারেটের মতো। আমি ভাবলাম, গাঁজা কোনো নেশাই না। না হলে এভাবে টানছে কেন। আমিও টানতে লাগলাম। পাঁচ-ছয়টি টান দেয়ার পর মনে হলো পৃথিবী আমাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। আমি মাটিতে শুয়ে পড়লাম। তারপর মনে হলো আমার চোখের সামনে কে পাঁচশ টাকার নোট ধরে রেখেছে। একটি নয়, শত শত। আমি হাত বাড়ালেই ধরতে পারি, কিন্তু ইচ্ছে করেই ধরছি না।

কিছুক্ষণ পর আমার হাসি পেলো, ভীষণ হাসি। আমি হো… হো… করে হাসতে লাগলাম। সব কিছুই বুঝতে পারছিলাম কিন্তু কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি আমার ছিল না। এক সময় বাকি দু’টি শেষ করে দুলালও আমার পাশে শুয়ে পড়লো। তারপর যখন দেখলাম সূর্য বিশ্বকে আলোকিত করে তাপ ছড়াচ্ছে তখন আমরা উঠে হলে গেলাম। এখন দুলাল আমার কাছে হার মানে। গাঁজার টান দেখে সেদিন দুলাল আমাকে ওস্তাদ মেনেছিল। সে দিন টেনেছিলাম কলকি দিয়ে। ওহ্… আমার একটু বাইরে যেতে হবে। তুই আমাকে ফোন করিস।’ কথাগুলো এক দমে বলে শোভন বেরিয়ে গেলো। সাজিদ থ’ হয়ে তাকিয়ে রইলো।

( চলবে……….)

Disclaimer: এই উপন্যাসের সকল চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক। বাস্তব জীবনে কারো সঙ্গে মিলে গেলে কেবলই কাকতালীয়।(প্রথম প্রকাশ: ১৯৯৬, দ্বিতীয় প্রকাশ ২০১৯)।ধূমপান, মদ্যপান ও যে কোনো রকমের মাদক গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ও অনেক জটিল রোগের কারণ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com