শুক্রবার, ১৬ অগাস্ট ২০১৯, ০৩:২৮ পূর্বাহ্ন

রোহিঙ্গাদের নিয়ে অবশেষে সুখবর পেল বাংলাদেশ

রোহিঙ্গাদের নিয়ে অবশেষে সুখবর পেল বাংলাদেশ

অবশেষে রোহিঙ্গাদের জন্য সুখবর দিচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়। সূত্র জানায়, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে ‘নন-মিলিটারি সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এ উদ্যোগে রাশিয়ার সমর্থন রয়েছে। মিয়ানমারও এ বিষয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি। এছাড়া রাখাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীনও সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবে, যাতে রোহিঙ্গারা সেখানে স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে আশ্বস্ত হয়। আর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এ ধরনের সেফ জোনের দেখভালের দায়িত্ব আসিয়ানের হাতে থাকার বিষয়টিও এখন আলোচনায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা।

জানা যায়, রাখাইনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর অধীনে ‘সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকেই বিরোধিতা করে আসছে মিয়ানমার। সেখানেকার তৃতীয় শক্তি বা দেশের সেনা মোতায়েন ও হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না দেশটি। ‘সেফ জোন’ নিয়ে মিয়ানমারের এ বিরোধিতার সঙ্গে চীনেরও সমর্থন রয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের বর্বরতার অভিজ্ঞতায়কে রোহিঙ্গারা সাফ জানিয়েছে ‘সেফ জোন’ বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়া কোনোভাবেই নিজ ভূমিতে ফিরতে চাই না। রাহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি যখন মাসের পর মাস উপেক্ষিত ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই এ নতুন প্রস্তাব নিয়ে এগোতে চাইছে বাংলাদেশ। আর তা হলো রাখাইনে ‘নন-মিলিটারি সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠা।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর প্রথম ও প্রধান দাবিই হচ্ছে সেখানে ‘সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠা করা। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী যে নির্মম গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন চালিয়েছে, সেই বিভৎসতার মধ্যে আর ফিরতে চায় না তারা। তবে তারা ফিরে যেতে চায় কয়েকটি মৌলিক শর্তে, আর তা হলো তাদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে, তাদের জমি ও বাড়িঘর ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু এতদিন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর অধীনে ‘সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠার দাবি উঠলেও তা এখন বাস্তবে সম্ভব নয়। কারণ, কৌশলগত কারণে এ অঞ্চলে কোনো তৃতীয়পক্ষের হস্তক্ষেপ চাইছে না চীন, রাশিয়া, ভারত ও মিয়ানমার।

ফলে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এবং জাতিসংঘের সহায়তায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করতে হবে, এটাই এখন বাস্তবতা। তাই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কী হবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত কীভাবে হবে সেটিই এখন প্রধান আলোচনার বিষয়।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় হয়। সেখানে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনায় চীন বলেছে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক উপায়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি উপায় অর্থাৎ ‘নন-মিলিটারি সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠার উপায় খুঁজে বের করতে মধ্যস্থতা করবে চীন।

এছাড়া রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে সে বিষয়েও সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবে এবং মিয়ানমারকেও এ বিষয়ে বোঝাবে চীন।

সূত্র আরও জানায়, রাখাইনে ‘নন-মিলিটারি সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন রাশিয়া সফরকালে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ড. মোমেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানান, যেহেতু বিভিন্ন দেশের মিলিটারি সমন্বয়ে গঠিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর মোতায়েন সম্ভব নয়, তাই রাখাইনে ‘নন-মিলিটারি সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। সেখানে মিয়ানমারসহ আসিয়ান দেশ, রাশিয়া ও চীনের প্রতিনিধিও থাকতে পারে। এতে রোহিঙ্গারাও ফিরতে নিরাপদ বোধ করবে এবং মিয়ানমারেরও আশঙ্কার কারণ থাকবে না। তবে রাখাইনে ‘নন-মিলিটারি সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠা ও মনিটরিংয়ের সার্বিক দায়িত্বে আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানের হাতেও থাকতে পারে বলে জানান ড. মোমেন। বাংলাদেশের এ প্রস্তাবটি সমর্থন করেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্গেই ল্যাভরভ। তিনি জানান, এ বিষয়টি নিয়ে তারা মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করবেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্গেই ল্যাভরভ শিগগিরই বাংলাদেশ সফরেও আসবেন বলে জানায় সূত্র।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রাখাইনে ‘সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠার গতানুগতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে মিয়ানমার ও চীনের ঘোরতর আপত্তি আছে। সেখানে কোনো তৃতীয়পক্ষের হস্তক্ষেপ চাই না চীন ও মিয়ানমার। তবে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি নিরাপত্তা বলয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সম্মতি রয়েছে চীন ও মিয়ানমারের।

সূত্র জানায়, নন-মিলিটারি বা সিভিল সেফ জোন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বাংলাদেশ একাধিকবার প্রস্তাবনা উত্থাপন করলেও তাতে আপত্তি করেনি মিয়ানমার। কারণ, রাখাইনে নিরাপত্তা বলয় ছাড়া রোহিঙ্গারা ফিরবে না এটা মিয়ানমারও জানে।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক চীন সফরের ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করার বিষয়ে একটি প্রক্রিয়া দ্রুত নির্ধারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এজন্য চীনের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী রোহিঙ্গা নিয়ে অলোচনা করতে শিগগিরই মিয়ানমারে সফর করতে পারেন। বাংলাদেশ চীনের আশ্বাসে শতভাগ আস্থা রাখতে চায়, সেটা চীন সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মিয়ানমারের দুটি টিম এ মাসের মধ্যেই পৃথকভাবে কক্সবাজার সফরে আসবে। এ দুটি টিম আসার দিনক্ষণ এখনও ঠিক হয়নি, তবে আলোচনা চলছে। এ দুটি টিম কক্সবাজার সফরকালে রাখাইনে ফিরে যাওয়া নিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের রাজি করানোর চেষ্টা করবে। নিরাপত্তা নিয়েও রোহিঙ্গাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হবে।


© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com