বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০১:০০ অপরাহ্ন

‘সুপ্রিম কোর্ট’র বিজ্ঞপ্তি আদালত সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা নয়’

‘সুপ্রিম কোর্ট’র বিজ্ঞপ্তি আদালত সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা নয়’

বিচারাধীন বিষয়ে সংবাদ পরিবেশনে বিরত থাকতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের অনুরোধ সম্বলিত বিজ্ঞপ্তি আদালত সাংবাদিকতায় কোনো প্রতিবন্ধকতা নয় বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক।

বিচারাধীন বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের গত বৃহস্পতিবারের দেওয়া বিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষাপটে এ আইনজীবী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: ‘সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যে অনুরোধ করেছে তাতে আমার মনে হয় একটু সাবধানতার কথা বলা হয়েছে। এটাকে আমি কোনো প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছি না।’

ড. শাহদীন মালিক বলেন: ওইদিন কোর্টে তো অনেক কিছু হয়েছে। সেই সাথে সাথে রিপোর্টিংও হয়েছে। আমার ধারণা, হয়ত ওইদিন বিকেলে বিষয়টি বিচারপতিদের নজরে পড়েছে। হয়ত কিছু রিপোর্টিংয়ে কিছু ভুল- ভ্রান্তি হয়েছে বা সঠিকভাবে উপস্থাপন হয়নি। ওটার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যে বিজ্ঞপ্তিটা এসেছে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে সেটা হয়ত তারা অতটা চিন্তাভাবনা করে দেয়া হয়নি।

তিনি বলেন: যে বিজ্ঞপ্তি এসেছে, আমার মনে হয় আদালত রিপোর্টিংয়ে এটা কোনো বাধা তৈরি করবে না। তবে রিপোর্টিংয়ের সময় একটা ব্যাপার সবাইকে নজর রাখতে হবে যে, কোর্টের যে মূল বিষয়বস্তু সেটা নিয়ে যেন রিপোর্টিং হয়। ওখানে অনেক সময় আইনজীবী বিচারপতিদের মধ্যে অনেক কথাবার্তা হয়।

যা হয়ত মূল বিচার্য বিষয়ের সাথে জড়িত না। এগুলো রিপোর্টিং হোক তা আমরা কেউই চাই না। মামলার মূল কথা, পক্ষগুলোর কথা বলা যেতে পারে। তবে এমনভাবে রিপোর্টিং করতে হবে যাতে বিচারাধীন মামলায় কোনো প্রভাব বা জনমনে ক্রিয়া সৃষ্টি না হয়।’

ড. শাহদীন মালিক আরো বলেন: ‘গত বৃহস্পতিবার যে ঘটনাটা হয়েছে আমার মনে হয় ওইখানে হয়তো অনেক কথাবার্তা হয়েছে যেটা কোর্টের সিদ্ধান্ত হিসেব চলে এসেছে মিডিয়াতে। দর্শকরা হয়ত বুঝতে পারছেন না যে ওটা কোর্টের মন্তব্য, ওটা কোর্টের সিদ্ধান্ত না। ওখান থেকেই হয়ত ভুল বোঝাবুঝির প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বিজ্ঞপ্তিটা এসেছে।

এই আইনজীবী জানান: সাংবিধানিকভাবে আদালত হলো উন্মুক্ত স্থান। মিডিয়া হলো এই উন্মুক্ততা বজায় রাখার একটা অংশ। অতএব আদালতে মামলার কী হচ্ছে তা বলা যাবে না বললে সেটা অবশ্যই বাক স্বাধীনতার পরিপন্থী।

আমার ধারণা, ভেবেচিন্তে রিপোর্টিং করতে কোনো বাধা নেই। আদালতে মামলার পক্ষে-বিপক্ষে কী বলা হচ্ছে তা নিশ্চয়ই বলা যাবে। তবে রিপোর্টিংটা যাতে এমনভাবে হয়, যেন মামলাকে কোনোভাবে প্রভাবিত না করে। এবং বিচারাধীন অবস্থায় মামলার ফলাফলের দিকে ইঙ্গিত না করে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চে ন্যাশনাল ব‌্যাংক লিমিটেড বনাম এম আর ট্রেডিং কোম্পানির একটি মামলার শুনানি চলছিল। শুনানির একপর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ মামলায় হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া ‌‘অস্বাভাবিক আদেশ’ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে প্রধান বিচারপরির প্রতি আহ্বান জানান।

এসময় কোর্টে উপস্থিত থাকা আইনজীবী হাসান আরিফ পরে সাংবাদিকদের বলেন: ‌‘হাইকোর্টের যে বেঞ্চে এর আগে এ বিষয়ে অর্ডার হয়েছিল, সেই বেঞ্চের বিষয়টি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো যেতে পারে বলে আদালতে বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এসময় আমি, ও আরো কয়েকজন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট সকলেই সমস্বরে তাতে সমর্থন জানিয়েছি।

সেই সাথে আমরা আদালতের কাছে আবেদন করেছি যে, বিষয়টি রাষ্ট্রপতির কাছে বা অন্য যেভাবে উপযুক্ত মনে করেন, সেভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। আর হাইকোর্টর আলোচ্য রায়টি যেহেতু একটি ডিভিশন (দ্বৈত) বেঞ্চ থেকে এসেছে সেক্ষেত্রে এর দায়ও যৌথ হওয়া উচিৎ।

সর্বোপরি হাইকোর্ট বেঞ্চের এ ধরনের অস্বাভাবিক (প্রিপস্টারাস) সিদ্ধান্তে আপিল বিভাগ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এবং আদালত মামলাটি পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করেছেন। আর এ মামলার বিবাদীকে এক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়।


এরপর এইদিন বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিচারাধীন বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করে একটি বিজ্ঞপ্তি দেয় হয়। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার মো: গোলাম রাব্বানী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়: ‘ ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে,

কোনো কোনো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া তাদের চ্যানেলে এবং কোনো কোনো প্রিন্ট মিডিয়া তাদের পত্রিকায় বিচারাধীন মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন, স্ক্রল করছে, যা একেবারেই অনভিপ্রেত। এমতাবস্থায়, বিচারাধীন কোন বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন/স্ক্রল করা থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

এরপর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের অনুরোধ সম্বলিত এ বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছ সুপ্রিম কোর্ট বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম ওই দিন সন্ধ্যায় প্রধান বিচারপতি বরাবর একটি চিঠি দেয়।

সংগঠনের সভাপতি ওয়াকিল আহমেদ হিরন ও সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আহসান রাজু স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে বলা হয়: ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ) বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছে যে আজ বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগে একটি মামলার শুনানিকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে বিচারাধীন মামলার প্রতিবেদন প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এ বিজ্ঞপ্তিতে আমরা সাংবাদিকরা ব্যথিত ও মর্মাহত।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়: দীর্ঘ কয়েকদশক ধরে আদালতে কর্মরত সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, জেল হত্যা মামলা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার শুনানিতে উপস্থিত থেকে প্রতিবেদন লিখে আসছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মানুষ মামলার খুঁটিনাটি বিষয় জেনে আসছিল। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রেখে আসছে গণমাধ্যম।

গত ৯ এপ্রিল মাননীয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এলআরএফ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতকালে বলেছিলেন, ‘আদালতে যা দেখবেন তাই লিখবেন।’ কিন্তু হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার মো. গোলাম রাব্বানীর স্বাক্ষরে যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে তা মাননীয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের (৯ এপ্রিলের) বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com