সোমবার, ১৫ জুলাই ২০১৯, ১২:২৬ পূর্বাহ্ন

জোড়া ফোলা : একটি জটিল সমস্যা

জোড়া ফোলা : একটি জটিল সমস্যা

ডা. জি, এম, জাহাঙ্গীর হোসেন:

জোড়া ইনজুরি ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ফোলা। ইনজুরি ও রোগের বিভিন্ন উপসর্গের মধ্যে ফোলা অন্যতম। জোড়া ফোলা যে কারণেই হোক এর জন্য জোড়ার বিভিন্ন জটিলতা হয়।

ফোলার কারণে জোড়ার বিভিন্ন স্তরে ক্ষতি হতে পারে। সুতরাং ফোলার কারণ দ্রুত অনুসন্ধান করে যথোপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করলে জোড়াকে ভয়াবহ ক্ষতি হতে রক্ষা করা যায়। জোড়াতে ফ্লুইড জমলে, অতিরিক্ত হাড় হলে, হাড় ও টিস্যুর টিউমার হলে এবং জোড়া সুসংগঠিত না হলে জোড়া ফোলে।

ইনজুরির তীব্রতা ও প্রকারভেদে জোড়া সঙ্গে সঙ্গে বা চার থেকে ছয় ঘণ্টা পরে ফুলতে পারে। কিছু কিছু জোড়া (যেমন কাঁধ) আঘাতের কারণে খুবই অল্প ফোলে কিন্তু জোড়ার আবরণ (ক্যাপসুল, ল্যাবরাম) ও পেশী ছিঁড়ে মারাÍক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অল্প বয়সে রিউমেটিক জ্বরে বড় জোড়া (গোড়ালি, হাঁটু) ফোলে।

পঁচিশ থেকে পঞ্চান্ন বছর বয়সে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস থেকে সাধারণত ছোট জোড়া (হাত ও পায়ের আঙুল) এবং কিছু ক্ষেত্রে বড় জোড়া আক্রান্ত হয়ে আস্তে আস্তে জোড়া ফুলতে থাকে। এ ছাড়া গাউটি (৭৫% ক্ষেত্রে পায়ের বুড়ো আঙুল), রিএকটিভ সোরিয়াটিক (১০% থেকে ২৫% ক্ষেত্রে জোড়া আক্রান্ত হয়), স্পোনডোলাইটিক ও অসটিওআথ্র্রাইটিসের জন্য জোড়া ফুলতে পারে।

এ ধরনের আথ্র্রাইটিসে জোড়া সাধারণত ছয় সপ্তাহের বেশি ফোলা থাকে। অসটিওআর্থ্রাইটিস বা গিটে বাত ওজন বহনকারী (হাঁটু, গোড়ালি ও হিপ) জোড়াকে আক্রান্ত করে এবং অল্প আকারে মাঝে মাঝে ফোলে আবার কমে যায়। সাইনোভাইটিস ও বার্সাইটিস হলে জোড়া ফোলে।

স্নায়ু সমস্যার কারণেও জয়েন্ট ফুলে যেতে পারে, যাকে চারকোট জয়েন্ট বলে। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাস ও টিবি (যক্ষ্মা) জীবাণু দ্বারা সংক্রমণ হলে জোড়া ফুলতে পারে। বয়স্কদের ব্যবহার জনিত ক্ষয়ের জন্য ফোলার সঙ্গে জোড়া আটকে যায় এবং জোড়ার দৃঢ় অবস্থান নষ্ট হয়। হাড় ও টিস্যুর টিউমার হলে জোড়া ফুলতে পারে।

জোড়া ফোলা সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে:
– ফোলার পরিমাণ কম বা বেশী?
– এক বা অধিক জোড়া ফোলা?
– শুরুটা কি হঠাৎ বা আস্তে আস্তে?
– প্রথম ফোলা?
– সব সময় থাকে বা মাঝে মাঝে ফোলে এবং ভাল হয়ে যায়?
– দিনে বা রাতে কখন ফোলা বাড়ে এবং কমে?
– কিসে ফোলা বাড়ে এবং কমে?

জোড়া ফোলার জটিলতা:
-ব্যথা।
-জোড়া নড়াচড়া করা কষ্টকর।
-জোড়া গরম ও লাল হতে পারে।
-পেশী শুকিয়ে যায়।
-লিগামেন্ট ঢিলা হয় এবং ছিঁড়ে যায়।
-হাড় ও তরুণাস্থি ক্ষয় হয়।
-আথ্র্রাইটিস হয়।
-পেশী দুর্বলতা এবং লিগামেন্ট ঢিলা বা ছেঁড়ার জন্য জোড়া -অস্থিতিশীল হয়।
-জোড়া জমে যায়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন?
-জোড়ার ফোলা সাত দিনের বেশি স্থায়ী হলে।
-ফোলা ছাড়াও জোড়া লাল এবং গরম হলে।
-শরীরে জ্বর বা ঠাণ্ডা অনুভূত হলে।
-আথ্র্রাইটিস ব্যতীত অন্য কারণে জোড়া ফুললে।
-যে কোন কারণে জোড়ায় ছিদ্র হলে।

মেডিক্যাল চিকিৎসা:
চিকিৎসা নির্ভর করে জোড়া ফোলার কারণসমূহ এবং এর তীব্রতার ওপর। সঠিক রোগ নির্ণয় করতে রোগের ইতিহাস শুনতে হবে, ভালভাবে শারীরিক পরীক্ষা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি পরীক্ষার সাহায্য নিতে হবে। যেমন : আর্থ্রোসিনটোসিস করে জয়েন্ট ফ্লুউড পরীক্ষা, রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা, জোড়ার এক্স-রে, বোন স্ক্যান, সিটি স্ক্যান এবং এম আর আই।

যে কোন কারণেই ফুলে যাক না কেন জোড়াকে বিশ্রামে রাখতে হবে। স্পি­ন্ট বা জয়েন্ট সাপোর্ট দিয়ে জোড়াকে উঁচু করে রাখলে ফোলা ও ব্যথা কম হবে। আঘাতের কারণে জোড়া ফুললে, প্রতি ঘণ্টায় দশ থেকে পনেরো মিনিট করে বরফের বা ঠাণ্ডা পানির সেঁক দিলে ফোলা ও ব্যথা কমে আসবে। এভাবে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা চলতে থাকবে।

আথ্র্রাইটিস ও জীবাণু সংক্রমণের ক্ষেত্রে কুসুমগরম পানির সেঁক (মোয়েস্ট হিট) খুবই উপকারী। ব্যথা নিরাময়ের জন্য বেদনানাশক ও জীবাণু সংক্রমণের জন্য এ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন করতে হবে। আথ্র্রাইটিসে ব্যথার ওষুধ ছাড়াও রোগের প্রকৃতি পরিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত ওষুধ সেবন করতে হয়।

স্বল্প সময়ের জন্য স্টেরয়েড সেবন করলে দ্রুত ফোলা ও ব্যথা কমে আসে। আর্থোসিনটোসিস করে জয়েন্ট ফ্লুউড বের করে স্টেরয়েড এবং কখনও কখনও হায়ালুরোনিক এসিড ইনজেকশন জোড়ায় পুশ করলে উপসর্গ দ্রুত লাঘব হতে পারে। জোড়ার স্বাভাবিক নড়াচড়া ও পেশী শক্তিশালী হওয়ার ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হবে। কখনও কখনও ফিজিক্যাল থেরাপির (এস ডব্লিউ ডি ও ইউ এস টি) প্রয়োজন হয়।

আর্থ্রোস্কোপিক চিকিৎসা :
মেডিক্যাল বা কনজারভেটিভ চিকিৎসায় জোড়া ভাল না হলে বা জটিলতা দেখা দিয়ে সার্জিক্যাল বা আর্থ্রোস্কোপিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসা পদ্ধতি নিুরূপ:
-ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে আর্থ্রোস্কোপ জোড়ায় প্রবেশ করিয়ে জয়েন্ট বিসঙ্কোচন ও ওয়াশ-আউট করা যায়।

-অতিরিক্ত হাড় এবং বিচ্ছিন্ন হাড় ও তরুণাস্থি বের করা হয়।
-সাইনোভেকটমি, মেনিসেকটমি ও সাইনোভিয়াল বায়োপসি করা হয়।
-নতুন লিগামেন্ট তৈরি এবং মেনিসকাস ও পেশী রিপেয়ার করা হয়।
-জোড়ার আবরণ (ক্যাপসুল ও ল্যাবরাম) সেলাই করে জোড়া স্থানচ্যুতি রোধ করা যায়।
-আর্থ্রোস্কোপিক চিকিৎসার পর নিয়মিত ও পরিমিত পরিচর্যার (রিহেবিলিটেশন) মাধ্যমে জোড়ার স্বাভাবিক অবস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনতে হবে।


© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com