সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১২:২৫ পূর্বাহ্ন

অপ্রয়োজনীয় টেস্ট: রোগের বাণিজ্যিক প্রেসক্রিপশন

অপ্রয়োজনীয় টেস্ট: রোগের বাণিজ্যিক প্রেসক্রিপশন

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : 

আমার লেখা পড়ে হোক বা মানুষের কাছে শুনে হোক, আজকাল অনেক রোগী ওষুধের প্রেসক্রিপশন ও ডায়াগনস্টিক টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে আমার কাছে পরামর্শের জন্য আসছে। আমাদের দেশে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে পেশেন্ট কাউন্সেলিং বা রোগীকে পরামর্শদান বলে কোনো জিনিস নেই।

আর ইদানীং অনেক রোগী চিকিৎসকদের বিশ্বাসও করে না। তারা সঙ্গত কারণেই মনে করেন চিকিৎসকরা অপ্রয়োজনীয় অনেক ডায়াগনস্টিক টেস্টের জন্য রোগীকে বাধ্য করেন এবং ডায়াগনস্টিক টেস্টের রিপোর্ট আসার আগেই রোগীকে বেশকিছু ওষুধ ধরিয়ে দেন।

আমি অসংখ্য প্রেসক্রিপশন ও ডায়াগনস্টিক টেস্টের রিপোর্ট দেখে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর সত্যতা পেয়েছি। প্রায়ই দেখি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডায়াগনস্টিক টেস্টের রিপোর্টের সঙ্গে প্রদত্ত ওষুধের কোনো সম্পর্ক নেই। আর মাত্রাতিরিক্ত ডায়াগনস্টিক টেস্টের পরামর্শদানেরও কোনো যৌক্তিকতা নেই।

বেশিরভাগ ডায়াগনস্টিক টেস্টের সুপারিশ করা হয় ব্যবসায়িক কারণে এবং রোগী ঠকানোর জন্য। সবচেয়ে মজার ব্যাপার- চিকিৎসকের আত্মীয় বা পরিচিত রোগী হলে ডায়াগনস্টিক টেস্টের লিস্টের পাশে চিকিৎসক লিখে থাকেন, ‘৪০ বা ৫০ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট’।

আমার প্রশ্ন, ডায়াগনস্টিক টেস্টের মোট বিল যদি ১০ হাজার টাকা হয় এবং তা থেকে যদি ৫০ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট দেয়া হয় তাহলে বাকি থাকে ৫ হাজার টাকা। এই বাকি ৫ হাজার টাকার মধ্যে টেস্টগুলো করতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ কত টাকা খরচ হয়, কত টাকা মুনাফা রাখা হয় এবং কত টাকা চিকিৎসককে কমিশন দেয়া হয়? আর ডিসকাউন্ট দেয়ার পরও যদি মুনাফা থেকে থাকে, তাহলে ডিসকাউন্ট দেয়া না হলে মুনাফার অঙ্কটা কেমন দাঁড়াত?

অনেকেই হয়তো বলবেন, ডিসকাউন্টের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা কমিশন নেন না। তার মানে চিকিৎসকরা অনৈতিকভাবে কমিশন নেন এবং এর ভার বইতে ও সইতে হয় নিরীহ-দরিদ্র রোগীকে। এটা কোন বিচার? একটি সত্য ঘটনা বলি। এক হাসপাতালে একটি ডায়াগনস্টিক টেস্টের জন্য তিনশ’ টাকা ফি নেয়া হতো।

পাশে সমমানের অন্য এক হাসপাতাল একই পদ্ধতিতে একই টেস্টের জন্য ফি নিচ্ছিল পাঁচশ’ টাকা। আগের হাসপাতালটি এটা জানার পর সমতা আনার জন্য রাতারাতি তিনশ’ টাকার ফি পাঁচশ’ টাকায় বাড়িয়ে দিল। এভাবেই ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো অসহায় মানুষের গলা কাটছে এবং আমরা কেউই কিছু বলছি না, করছি না।

আমি অসংখ্য প্রেসক্রিপশন দেখি যার মধ্যে বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধ। আমি এমন একটি প্রেসক্রিপশন পেয়েছি যেখানে রোগীকে দশটি ওষুধ প্রদান করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ছয়টিই অপ্রয়োজনীয়।

এসব অপ্রয়োজনীয় ওষুধকে অভিহিত করা যায় ‘বাণিজ্যিক’ ওষুধ হিসেবে। প্রেসক্রিপশনে বর্ণিত রোগের সঙ্গে এসব ওষুধের কোনো সম্পর্ক নেই। রোগের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও এসব ওষুধের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে কোম্পানির মুনাফা এবং চিকিৎসকের কমিশনের।

কোম্পানির মুনাফা আর চিকিৎসকের কমিশনের জন্য অসহায় গরিব রোগীর ওপর একগাদা অপ্রয়োজনীয় ওষুধের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হলে রোগী একাধিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। প্রথমত, রোগীকে প্রচুর টাকা খরচ করে এসব ওষুধ কিনতে হয়। রোগী যদি গরিব হন তবে পরিবারের অত্যাবশ্যকীয় খরচ বাদ দিয়ে স্ত্রী সন্তান-সন্ততিকে অনাহারে-অর্ধাহারে রেখে হলেও তাকে চিকিৎসক কর্তৃক প্রদত্ত অপ্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে হয়।

দ্বিতীয়ত, এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়াকে ধর্তব্যের মধ্যে নিতে হবে। মনে রাখা দরকার, প্রতিটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়া রয়েছে এবং কোনো কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়া ভয়ংকর হতে পারে। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়ায় প্রায় আট লাখ মানুষ মারা যায়।

তৃতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় ওষুধের কারণে রোগীর শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়া দেখা দিলে তার চিকিৎসার জন্য রোগীকে আবার চিকিৎসকের কাছে দৌড়াতে হয় এবং চিকিৎসক তাকে নতুন করে আরও বেশকিছু ডায়াগনস্টিক টেস্ট ও ওষুধ ধরিয়ে দেন। এ হল মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, যা সইবার ক্ষমতা বেশিরভাগ রোগীরই নেই।

এসব কথা চিন্তা করেই আমি প্রায়ই চিকিৎসক ও কোম্পানিগুলোকে কিঞ্চিৎ হলেও নৈতিক ও মানবিক আচরণ করার আহ্বান জানাই। তবে ব্যতিক্রমধর্মী কিছু প্রেসক্রিপশন আমার হাতে আসে যেখানে খুব সীমিতসংখ্যক ওষুধ প্রেসক্রাইব করা হয় এবং সেগুলো প্রয়োজনীয়ও বটে। অনেক চিকিৎসক একান্ত প্রয়োজন ছাড়া রোগীকে ডায়াগনস্টিক টেস্টের পরামর্শ দেন না।

চিকিৎসা পেশার নীতির অনুসারী অনেক মেধাবী চিকিৎসক এ দেশে রয়েছেন, যারা অনৈতিক আর্থিক ফায়দার জন্য কোনোদিন নীতি-আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে প্র্যাকটিস করেননি এবং এখনও করেন না। তাদের আমি সাধুবাদ জানাই।

চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানিগুলো কর্তৃক বিশ্বের অধিকাংশ মানুষকে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় ওষুধে অতিমাত্রায় আসক্ত করে তোলার ব্যাপারটি শুধু অনুন্নত বিশ্বেই সীমাবদ্ধ নয়; পশ্চিমা দেশগুলোতে টেলিভিশনের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়- নাম ও টেলিফোন নম্বর মনে রাখার জন্য স্মরণশক্তি বাড়াতে মানুষের ওষুধ গ্রহণ প্রয়োজন! এসব হচ্ছে মানুষকে ওষুধের প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত করে তোলার একটি ফাঁদ।

ওষুধের প্রতি মানুষের আসক্তি বা নির্ভরতা যত বাড়বে ওষুধ কোম্পানিগুলোর মুনাফা তত বাড়বে। বর্তমান বিশ্বে বহু মানুষ প্রতি মাসে তাদের বাড়িভাড়া, গাড়ির খরচ, যাবতীয় বিলের পেছনে যত টাকা খরচ করে, তার চেয়ে বেশি ব্যয় করে ওষুধের পেছনে। ওষুধের প্রতি আসক্তি ও নির্ভরতা কমানো অর্থ ও স্বাস্থ্যের জন্য অতি প্রয়োজন।

একান্ত জরুরি না হলে ওষুধ গ্রহণ পরিহার করে মানুষ অর্থ ও স্বাস্থ্য দুটোই সুরক্ষা করতে পারে। অনেকে সঙ্গত কারণেই আমাকে প্রশ্ন করেন- মানুষ যে পরিমাণ ওষুধ গ্রহণ করে তার সবই প্রয়োজনীয়, কার্যকর ও নিরাপদ কিনা।

অনেকেই বুঝতে পারেন না, আমরা যত বেশি ওষুধ গ্রহণ করব সমস্যাগুলো সেই অনুপাতে বাড়বে। আশপাশে বহু মানুষ আছে যারা প্রতিদিন ৫ থেকে ১০টি ওষুধ গ্রহণ করেন। এসব ওষুধের মধ্যে হয়তো একটি বা দুটি হল মূল রোগের জন্য, বাকিগুলো এ ওষুধের কারণে সৃষ্ট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিরাময়ের জন্য।

ওষুধ জীবনরক্ষাকারী বস্তু বলেই আমরা সবাই জানি; কিন্তু এ জীবনরক্ষাকারী ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়ার কারণে প্রতিবছর সারা বিশ্বে লাখ লাখ লোক মারা যায়। অসংখ্য মৃত্যু ছাড়াও বিশ্বের সর্বত্রই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও মিথস্ক্রিয়ার কারণে আরও লাখ লাখ মানুষ অসুস্থতা ও পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকে।

সুতরাং রোগমুক্তির নামে যখন-তখন ওষুধ গ্রহণের আগে গুরুত্বসহকারে ভাবা দরকার আদৌ সেই ওষুধের প্রয়োজন আছে কিনা। আর ওষুধ গ্রহণের আগে এটাও ভাবা দরকার, যে রোগের জন্য ওষুধ গ্রহণ করা হচ্ছে তা নিজের সৃষ্টি কিনা। রোগের জন্য নিজেই দায়ী হলে রোগ প্রতিরোধ করা দরকার। রোগ প্রতিরোধ করা গেলে আর ওষুধের দরকার হয় না।

কারও মাথাব্যথা বা গায়ে ব্যথা হওয়ার মানে এই নয় যে তার দেহে অ্যাসপিরিন বা প্যারাসিটামলের ঘাটতি রয়েছে। ওষুধের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হল ওষুধ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগের মূল কারণ দূর না করে উপসর্গ নিরসনে ব্যবহৃত হয়।

ধরা যাক সংক্রামক রোগের জন্য কারও জ্বর হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মূল রোগটির চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল প্রদানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ অফিসে দিনের পর দিন মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করে মাথাব্যথায় আক্রান্ত হলে সে ক্ষেত্রে প্যারাসিটামলে হয়তো ব্যথা সাময়িকভাবে সারবে।

কিন্তু ক্রমাগত মাথাব্যথা আর ধারাবাহিক মানসিক চাপের কারণে কেউ যদি হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়, তবে তা মাথাব্যথার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠবে। সুতরাং ওষুধ গ্রহণের আগে ঠিক করা দরকার সমস্যার মূল কারণটা কোথায় লুকিয়ে আছে। সমস্যা খুঁজে বের করে তার সমাধানের দিকে দৃষ্টি দিলে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে হবে না, ওষুধেরও প্রয়োজন হবে না।

শীতকাল এলে একধরনের ওষুধের চাহিদা বেড়ে যায়। এ সময় সর্দি-কাশি-জ্বরের প্রকোপ বেড়ে যায়। ভাইরাসজনিত এসব সমস্যা ওষুধ ছাড়াই এমনিতে ভালো হয়ে যায়। তারপরও চিকিৎসকরা বহু মানুষকে সর্দি-কাশি-জ্বর-গলাব্যথার জন্য গাদা গাদা ওষুধ প্রদান করেন। কাশিতে কফসিরাপ কাজ করে না।

এতে থাকে ক্ষতিকর উপকরণ। অ্যান্টিহিস্টামিন উপকারের চেয়ে অপকার করে বেশি; বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। সুতরাং লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে ওষুধ ছাড়া সুস্থ থাকার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করলে শীতকাল সবার জন্য উপভোগ্য হবে। অপ্রয়োজনীয় ওষুধের দরকার হবে না।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত একটি ওষুধ হল অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা বিষাদগ্রস্ততা দূরীকরণের ওষুধ। যুক্তরাষ্ট্রে ২ কোটি মানুষ নানারকম বিষাদগ্রস্ততায় ভোগে এবং তারা নানা পদের ওষুধ গ্রহণ করে থাকে। ডিপ্রেশনকে চিকিৎসকরা মানসিক ব্যাধি বা মুড ডিসঅর্ডার হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতো আমিও মনে করি বিষাদগ্রস্ততা কোনো রোগ নয়। কয়েক বছর আগেও আমরা ভাবতেই পারতাম না, মেজাজ পরিবর্তন আমাদের শারীরিক অবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে এবং এর জন্য হরেক রকম ওষুধের প্রয়োজন হবে। এখন বিশ্ব^জুড়েই বিষাদগ্রস্ততাকে মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে চিকিৎসকরা প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার ওষুধ প্রেসক্রাইব করছেন।

সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না, এসব হচ্ছে ওষুধ কোম্পানির চাল ও প্রতারণা। পশ্চিমা প্রচার মাধ্যম, ইন্টারনেটে প্রবন্ধ ও জার্নাল পড়তে গিয়ে প্রায়ই দেখি- ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য নতুন নতুন রোগ আবিষ্কার করছে। রোগ নয় এমন শারীরিক অবস্থাকেও তারা রোগ হিসেবে আখ্যায়িত করে ওষুধ প্রদানের জন্য চিকিৎসকদের উদ্বুদ্ধ করছে।

এ ধরনের রোগের মধ্যে ‘অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, রেস্টলেস লেগ সিন্ড্রম, অস্টিওপোরোসিস, সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, ইরিটেবল বাউল সিন্ড্রম (আইবিএস), মাথায় টাক পড়া অন্যতম। হতাশা ও বিষাদগ্রস্ততাও এ শ্রেণীভুক্ত বলে আমি মনে করি।

আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে দিনটি কীভাবে শুরু করবেন, দিনের কাজগুলো কীভাবে সাজাবেন, দিনটি কত সুন্দর ও সফলভাবে অতিবাহিত করবেন, তা নির্ভর করবে আপনার সুচিন্তিত পরিকল্পনার ওপর। আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থবিত্ত, মান-সম্মান, যশ-প্রতিপত্তির পেছনে অসম প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতে গিয়ে বেসামাল জীবনযাপন করি বলে আমাদের অজান্তেই শরীর-মনে বাসা বাঁধে নানা অযাচিত রোগ।

তখন দরকার ওষুধের। সেই ওষুধের প্রয়োজন সাময়িক নয়, হয়তো সারা জীবনের জন্য। ওষুধ গ্রহণের প্রবল প্রবণতা মানুষকে অন্যান্য জীবজন্তু থেকে আলাদা শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। আর ওষুধ কোম্পানিগুলো ভালোভাবেই এটি জানে। একটু লক্ষ্য করুন, আপনি অসুস্থ নন, তারপরও যদি আপনাকে অসুস্থ বলে ওষুধের দিকে ঠেলে দেয়া হয়, তখন সেটা আপনার জন্য কত বড় মানসিক রোগের কারণ হয়ে পড়ে।

শুধু মানসিক চাপের কথাই বলি কেন, অর্থবিত্তের দিকটা খাটো করে দেখার অবকাশ আছে কি? এরপর রয়েছে আপনার শরীরের ওপর ওষুধের হরেক রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে সারা বিশ্বে প্রতিবছর লাখো মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

‘ডিজিজ মংগারিং’ বা রোগের কারবারিদের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। নতুন নতুন রোগ তৈরি করে সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে তোলার এই সার্বিক প্রক্রিয়ায় অসংখ্য শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জড়িত আছে।

বলিরপাঁঠা হিসেবে আমরা যা করতে পারি তা হল- নিজের অবস্থানকে নিজেই অনুধাবন করার শক্তি অর্জন করা। ওষুধ কোম্পানিগুলো আমার বা আমার পরিবারের সদস্যদের ওপর ব্যবসায়িক আগ্রাসন চালাবে এটা আমরা হতে দিতে পারি না।

শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা আর মৃত্যুর ব্যাপারে মানুষ দুর্বল থাকে, ভয়-ভীতি সব সময় তাড়িয়ে বেড়ায়। আর তাই একটু ভালো থাকা, সুস্থ থাকা আর বেশিদিন বাঁচার তাগিদে আমরা ওষুধ কোম্পানিগুলোর ফাঁদে পা দেই। এটা কাম্য হতে পারে না। তাই প্রত্যেক মানুষের দরকার মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সুস্থ জীবনযাপনে তৎপর হওয়া।

অস্বাভাবিক জীবনযাপন ও নিয়ম না মানার কারণে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অসুস্থ হলেই মানুষ চিকিৎসকের কাছে দৌড়ায়। বেশিরভাগ চিকিৎসক রোগীকে অসংখ্য ওষুধ ধরিয়ে দেন যার বেশিরভাগই হয়তো অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে রোগীর কিছু করার থাকে না। বাধ্য হয়ে রোগীকে হরেক রকম ওষুধে অভ্যস্ত হয়ে পড়তে হয়। অসুস্থ হলে জীবন স্বাভাবিক নিয়মে চলে না।

সর্বক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, জীবনের সুখ-শান্তি নষ্ট হয়, টাকা-পয়সার অপচয় হয়। জীবনে নেমে আসে চরম কষ্ট-দুর্ভোগ। একটু সুস্থ চিন্তা, একটু স্বাস্থ্য সচেতনতা আর একটু মানসিক দৃঢ়তা যদি আমাদের একটি সুস্থ, সুন্দর ও সুখী জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিতে পারে, তাহলে আমরা তা করি না কেন, মেনে চলি না কেন? পর্যাপ্ত ব্যায়াম, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান, পর্যাপ্ত ঘুম, দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপনসহ আরও গুটিকয়েক নিয়ম মেনে চলে জীবনকে সুস্থ-সুন্দর রাখা খুব কঠিন কাজ নয়।

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : অধ্যাপক, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

drmuniruddin@gmail.com


© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com