শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ০৭:১০ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ল ৬ শতাংশ

মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ল ৬ শতাংশ

বিশেষ প্রতিনিধি, আজকাল, ঢাকা: 

জীবন ধারণের সব পণ্যেরই দাম বেড়ে যাচ্ছে। আর এই দাম বৃদ্ধিই আরও উসকে দিয়েছে ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয়। সদ্য সমাপ্ত এ বছরে দেশের মানুষের জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬ শতাংশ। তবে এই ব্যয় বৃদ্ধি আগের বছরের চেয়ে কম বেড়েছে। একই সঙ্গে পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।

পূর্ববর্তী ২০১৭ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছিল ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ, পণ্যমূল্য ও সেবা সার্ভিসের মূল্য বেড়েছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ আগের বছরের চেয়ে গত বছর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ পয়েন্ট কম।

বেসরকারী প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য ওঠে এসেছে।

ভোক্তার ঝুলিতে যেসব পণ্য ও সেবা রয়েছে সেসব পণ্য ও সেবা পরিবারের মোট ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে পণ্য ও সেবার ওজনের ভিত্তিতে শহুরে জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই হিসাব বের করেছে ক্যাব। দেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ গ্রামে থাকলেও নিজেদের সামর্থ্যরে অভাবে ব্যয়ের সার্বিক চিত্র তুলে আনা সম্ভব হয়নি জানিয়েই ক্যাব চেয়ারম্যান বলেন, ‘শহুরে এই হিসাব সার্বিক চিত্র সম্পর্কে একটি আংশিক ধারণা দেবে।’

ক্যাবের পর্যবেক্ষণ, ২০১৮ সালে অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল ছিল। মোটা চালের দাম ১৫ শতাংশ, ডালের দাম গড়ে ১৭ শতাংশ, তেলের দাম ২ শতাংশ, মসলার দাম ২২ শতাংশ, শাক-সবজির দাম প্রায় ১১ শতাংশ এবং চিনির দাম ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমেছে।

ক্যাবের হিসাবে ২০১৮ সালে এর আগের বছরের তুলনায় সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে সাবানের। এই পণ্যটির দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া চালের গড় মূল্য ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ, মাছের দাম ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ, শাক-সবজিতে ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ, পান-সুপারিতে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ, তরল দুধে ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ দাম বেড়েছে।

২০১৮ সালে এর আগের বছরের তুলনায় ডাল, লবণ, মসলা, চিনির দাম কিছুটা কমেছে। দেশী মসুর ডালে ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ, আমদানি করা মসুর ডালে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ, আস্ত ছোলার দাম ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ, দেশী রসুন ২০ দশমিক ৫৩ শতাংশ, আমদানি রসুন ৩২ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমেছে।

ভোজ্য তেল, গুঁড়ো দুধ, গ্যাস, বিদ্যুত, জ্বালানি তেল ও রেলের ভাড়া এই বছর ছিল অপরিবর্তিত। এই ব্যয়বৃদ্ধি যৌক্তিক কি না- সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের গোলাম রহমান বলেন, ব্যয় বৃদ্ধির এই হার ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিত্বে ভিন্ন রকম ফল বয়ে আনতে পারে। ব্যয় অনুপাতে একজন ব্যক্তির আয় বৃদ্ধি না পেলে তো সেটা স্বস্তিদায়ক হবে না। তিনি বলেন, আয় বৃদ্ধির ওপর আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। যদি ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় মানুষের আয় বৃদ্ধি হয় তাহলে সেটাই হবে স্বস্তিদায়ক।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিগত বছর আমদানি শুল্ক বাবদ এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে ভোক্তাদের। এটি প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের তুলনায় অনেক বেশি। ভোক্তাদের ওপর থেকে এই শুল্কের হার কমাতে হবে। বাংলাদেশে আমদানি পণ্যের ওপর ২০১৭ সালে গড়ে ২৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ শুল্কারোপ করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে গড়ে শুল্ক ছিল ৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ, কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় এর হার ছিল ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ।

ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ক্যাবের পক্ষ থেকে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হলো- ধান-চালের মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষককে উৎপাদিত ফসলের উপযুক্ত মূল্য দিতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘কন্ট্রাক গ্রোয়িং পদ্ধতি’ অনুসরণ করে ধান কাটার মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি শস্য সংগ্রহ করা এবং শস্য বীমার প্রবর্তন করা।

ক্যাবের প্রস্তাব অনুযায়ী বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে সংস্কার এবং ‘প্রাইস স্ট্যাবলাইজেশন ফান্ড’ গঠন করে দেশে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা। এলএনজি আমদানি সকল প্রকার শুল্ক-কর মুক্ত রেখে গ্যাসের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা। চিকিৎসকদের ফিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ, ওষুধের মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ; বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সুলভে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা প্রদান নিশ্চিত করা। ওষুধ নীতি বাস্তবায়ন করা।

বিএসটিআই ও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে শক্তিশালী ও কার্যকর করা। শিক্ষা খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করার লক্ষ্যে অবিলম্বে শিক্ষা আইন বাস্তবায়ন করা। শিক্ষার মানোন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। খেলাপী ঋণ ঠেকাতে সরকারী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নিয়োগ পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে পর্ষদের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং আইনের সংস্কার করে দ্রুত খেলাপী ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করা।

আমদানি শুল্কের ব্যাপক হ্রাস এবং লবণসহ যেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ অবিলম্বে সেসব পণ্যের অবাধ আমদানির সুযোগ সৃষ্টি করা। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তা-স্বার্থ সংরক্ষণে প্রণীত আইন ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯, প্রতিযোগিতা আইন ২০১২, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ এর বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল যাতে সুষম বণ্টন হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখা। আয় বৈষম্য নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

রাজধানীর ১৫টি খুচরা বাজার ও বিভিন্ন সেবার মধ্য থেকে ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী ও ১৪টি সেবার তথ্য পর্যালোচনা করে ক্যাব এ হিসাব করেছে। তবে এ হিসাবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রকৃত যাতায়াত ব্যয়বহির্ভূত।


© All rights reserved © 2017 AjKaal24.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com